প্রচ্ছদশিল্পীর ভূমিকায়

আর্যনীল মুখোপাধ্যায়

ঠিক করেছিলাম কৌরব অনলাইন ৬৬ সংখ্যা থেকে ওয়েবজিনের মলাট হবে অতীতের কোন একটি কাব্যগ্রন্থের প্রচ্ছদ। অবশ্যই সেই কবি ও প্রকাশকের অনুমতি পেলে। এক প্রচ্ছদশিল্পীর ভূমিকায় নীলাব্জ চক্রবর্তীকে চাইনি। কৌরবের অগুন্তি ওয়েব ও মুদ্রিত সংখ্যার মতোই এবারেও তাকে চেয়েছিলাম কবি হিসেবে। নীলাব্জ যে শেষ পর্যন্ত প্রচ্ছদশিল্পী হয়ে এলো এই সংখ্যার কৌরবে, সেটা একার্থে বেদনার। আর এই বেদনার শরীর আমরা বহন করছি এই সংখ্যার প্রায় সমস্ত কবি যাঁরা তার অগ্রজ, সমসাময়িক ও অনুজ। স্নেহ, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা ও তারিফে যাদের প্রায় সকলেই নীলাব্জকে বেঁধেছেন।

প্রচ্ছদশিল্পীর ভূমিকা আড়ালের বিমূর্তায়ন খোঁজা। আর তাকে একরূপে পেয়ে রূপান্তরিত করা। পাণ্ডুলিপির পাতা উল্টে তার সারবস্তু চিনতে গিয়ে বেশিরভাগ সময়েই এক অন্যরূপকে ধরে ফেলা, অন্য রূপক-এ, আড়ালের এক অনুকৃতি তৈরি করে ফেলা। এইই প্রচ্ছদশিল্পীর কাজ। এর বেশি থাকা তার নেই কাব্যাকল্পের বাসাবাড়িতে। কিন্তু গত ১৮ই নভেম্বর দেহাতীত হয়ে যাওয়া নীলাব্জর কবিতার ধূপে ভরে যাক এই সংখ্যার কবিতা, আর তার নিজস্ব অনুপস্থিতি – এই প্রার্থনায় গড়ে নেওয়া এই ভূমিকা।  

কৌরব পত্রিকার মানিকতলার দপ্তরে নীলাব্জ চক্রবর্তী, আনুমানিক ২০১০

চিত্রস্বত্বঃ কৌরব কতৃপক্ষের সুদেষ্ণা মজুমদার

 

নীলাব্জ চক্রবর্তীর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ পায় নয়া দশক প্রকাশনী থেকে ২০১১ সালের কলকাতা বইমেলায়রয়াল ক্রেম, অতি সূক্ষ্ম সোনালি কাগজে পীত হয়ে নতুন বৌয়ের নতুন হাতের মত ঝকঝকে  পীত কোলাব্জে নীলাব্জ সে বইয়ের যৌথ উৎসপত্রে সে আমার নাম করেদ্বিতীয় বই বাক প্রকাশনী থেকে ২০১৩ সালে, সেবার ইবুকনামগুলমোহররিপিট হচ্ছে উৎসর্গপত্রে কোনো একআপনি উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছিলো –‘উপেক্ষা করা হোলো শর্করা মাত্রার বিপদসীমা/ মিষ্টত্ব মার্জনীয়তৃতীয় বই পরের বছর বইমেলায়, ২০১৪, কৌরব প্রকাশনী থেকেপ্রচ্ছদশিল্পীর ভূমিকায়যে বইয়ের জুতো সেলাই না করলেও ণ্ডীপাঠ থেকে বাকি অনেকটাই আমার উপদেশেবইয়ের ভূমিকাও আমার লেখাবইটা নীলাব্জ এই পৃথিবীতে তার এক প্রিয়তম মানুষকে উত্সর্গ করেছিলোতার বাবাএরপর ২০১৭ সালে বেরয় স্বপ্রযোজনায়লেখক কতৃক প্রকাশিত সেখানেও সে আমার নাম তুলে দেয় কৃতজ্ঞতাপত্রেশেষ কাব্যগ্রন্থ কবিসম্মেলন প্রকাশনী থেকেতোমার অনেকদিন আমি আয়না লিখেছি (২০২৫) ছাড়াও নীলাব্জর একটি উপন্যাস প্রকাশ করে সৃষ্টিসুখ, এবছরইকোন চরিত্রই কাল্পনিক নয়

নীলাব্জর কবিতা তার স্বভাব, প্রবৃত্তিকে বহন করে তার শিল্পসাহিত্য বিশ্বাসের চেয়ে অনেক বেশিএটা তার পরিচিত সব কবি/পাঠকই জানেন, চেনেন সে স্বভাবকেসুমিষ্টতা, নম্রতা, সরসতা, সুরেলায়, বন্ধুত্বের উষ্ণতায় সে সর্বদা সমাদরেরপাশাপাশি কখনো তুমুল অভিমানী অনুনয়ীএই সমস্ত মেজাজই নীলাব্জর কবিতার আগাগোড়া জুড়েছেকিন্তু পাশাপাশি এসেছে, একেবারে প্রকাশের প্রথমার্ধ থেকেই, নানাবিধ খুচরো পরীক্ষানিরীক্ষাএই পরীক্ষাগুলি ভাবনাচিন্তার অভিযোজন গাঠনিকতা নিয়েতার স্থাপত্য নিয়েভাবনাচিন্তাকে কবি কীভাবে কবি প্রকাশ করবেন, তার আগে ভাবা উচিত কীভাবে তিনি ভাবনাটাকে গড়বেন, তার বিন্যাসকে হট্টমেলার কবিতার চেয়ে কীভাবে আলাদা করবেনএই দিকেই নীলাব্জ ধাবিত হচ্ছিলো। লিপির কাঠামোগত কিছু রকমফেরও রয়েছে কবিতায়তার এই টেকনিকগুলোকে অনুপ্রাণিত করছিলো তার সমসাময়িক সমান্তরাল ধারার বাংলা কবিতাএবং খুব স্পষ্টতই আমার নিজের কবিতার কিছু বিশ্বাস, কিছু চারিত্রিকতাসঙ্ঘের লেখালিখিতে এগুলো হয়, সৃষ্টিচেতনার সংক্রমণ রোগ সামুদায়িক কবিতাকর্মীদের অনেককেই কমবেশি ছুঁয়ে যায়, বিশ্বসাহিত্যের সমস্ত সঙ্ঘবদ্ধ কাব্যচর্চায় এর নির্দশন আছেএতে কবির ক্ষতি হয় কম, লাভই বেশি

প্রচ্ছদশিল্পীর ভূমিকায়কাব্যগ্রন্থের মুখবন্ধ আমি নিজেই লিখতে চেয়েছিলামনীলাব্জ এতে অতিশয় খুশি হয়েছিল যেমন বলাই বাহুল্য, লেখাটা পেয়ে সে কিছুটা হতাশও হয়েছিলো নিয়ে ওর অভিমান ছিল বরাবরএকাধিক অভিমান আমার ওপর – ‘প্রচ্ছদশিল্পীর ভূমিকায়’-এর মুখবন্ধটা সোমনাথ সেনের সমসাময়িক প্রথম কাব্যগ্রন্থপারদ শাসন’-এর জন্য আমার লেখা ভূমিকার মতো অমন তীক্ষ্ণ কেন হলো না, কেন আমি মনে করি কৌরবের দ্বিতীয় প্রজন্মের কবিতার চেয়ে নীলাব্জ চক্রবর্তীর কবিতানতুন কবিতা’- ঘরানার কাছাকাছি ইত্যাদিএক দশক কেটে গেছে নীলাব্জর সেই বই প্রকাশ পাবার পর১৮ই নভেম্বর, ২০২৫, গভীর রাতে চেন্নাই থেকে শ্রীপর্ণা আমায় মর্মান্তিক মেসেজ করে  – ‘নীলাব্জ আর নেই, রাত ১১-৪০  মেসেজ পাবার এক ঘন্টার মধ্যেই আমি আবার পড়িপ্রচ্ছদশিল্পীর ভূমিকায়বইটাগোটা বইটা, আর অব্যর্থভাবেই আমার সেই মুখবন্ধএক দশক পরেও নিজের লেখা সেইপ্রচ্ছদশিল্পীর ভূমিকাপড়ে আমার কোন দ্বিমত রইলো না আমি কবিকে ঠিক চিনেছি, চিনিয়েছিনীলাব্জর কবিতা তার চরিত্রের, স্বভাবের, প্রবৃত্তির সৎ দর্শন, মুক্ত পোর্টালআর তার প্রায় সবটাই জুড়ে রয়েছে এক নির্ভেজাল, অসমান্তরাল ভালোবাসার বিশ্বাস ও মিষ্টত্বআমি লিখেছিলাম

বাংলা কবিতায় একটা ‘চিত্ররূপময়তা’র বিখ্যাত ধারা আছে আমরা জানি। নীলাব্জ সেই ধারাকে আগত ও প্রগত করেন। আর এই প্রগতির প্রধান চরিত্র তার নিজের ভাষাতে – ‘বাতিল কুয়াশালিপির ওপর দিয়ে চলে যাওয়া’, ‘একটা ওপেন-এন্ডেড গল্পরেখা’  ও ‘ছাপাখানার ভেতর ও বাইরের সম্ভাব্যতার কথা’অনেক, অজস্র লিরিকি সম্ভাব্যতাকে এই বইছবির ‘নীলু’ তুলে ধরেছে আর সাথে সাথে সরিয়ে নিয়েছে। কোনো একটা ভাবনার গা পুড়িয়ে, তাকে রোদে সেঁকে, তিনমাস পর তার মুখের ওপর নিটোলরেখায় চোখ আঁকতে চায়নি। কোনো ভারী ভাবনা বা দর্শনকে, কোনো বিষয়বস্তু বা বিষয়ভাবনাকে সে তার আখড়ায় শরীরচর্চার অনুমোদন দেয়নি। এ আখড়া বরং চিত্রকরের। থুড়ি, প্রচ্ছদশিল্পীর। রোদেলা দিনে বালির ওপর শিশুদের যে অসম্পূর্ণ খেলা সেটাই নীলুর কবিতা। ভাবনা নয়, চিন্তা নয়, বরং তার জেশ্চার বা ব্যঞ্জনার বালি দিয়ে গড়া “প্রচ্ছদশিল্পীর ভূমিকায়”।

সামাজিকতার সর্বত্রই আছে এই নব্য-প্রচ্ছদশিল্পী। অনেক কিছুই সে দেখছে, শুনছে। সিনেমার পোকা এই নীলু দেখতে পায় – ‘গুটি গুটি হেঁটে আসছেন গুড্ডি’, ভাবছে ‘ইন্টারল্যুডে পিয়ানো বাজবে না স্যাক্স’; সে বুঝতে পারে আমরা ‘যে যার স্মৃতিলেখাই লিখছি’; ‘সহলিপি বিষয়ক একটা পাতি লেখা’ও সে লিখতে যায় এক একদিন (যদিও লেখে না); ‘গাঢ় প্যান্টিতে গেঁথে রাখে’ তার চোখ; দেখতে পায় এক ‘মিল্কি ব্রাউন ওয়ে’ বা ‘সেনসেক্স শব্দটার আশেপাশের ভিড়’ বা ‘ভুট্টাক্ষেতেরই পাশে পাশে না দেখা বৃত্ত’। অথচ এর কোনোটার সাথেই সে জড়িয়ে পড়ে না। কিছুই করে না নীলু, নীলুর কোনো ইনভল্ভমেন্ট নেইকেবল ‘একটা দৃশ্য/তার গায়ে/ আটকে যাচ্ছে/আরেকটা দৃশ্যের খণ্ড ত’ 

আধুনিক জীবন, স্বভাব দর্শনের কবির ভাবনা জটিল হওয়াই উচিতসরল নয়কবিতাভাবনার এই জটিল বলয়টির ওপর আলো ফেলতে হলে দুটো প্রন্তবর্তী অবস্থান বা চরমসীমা আছেদুটো এক্সট্রিমএকটা উল্লম্ব বা নর্মাল প্রক্ষেপ, অন্যটা স্পর্শক বা ট্যাঞ্জেনশিয়ালপ্রথমটা বলয়ের ভেতরে যাবার উপক্রম করে, অন্যটা তার প্রচ্ছদ ছুঁয়ে বেরিয়ে যেতে চায়এই দুই চরমসীমার মধ্যে আরো অসংখ্য অবস্থানও আছে, শূন্য নব্বই ডিগ্রির মধ্যেআমি চাইতাম নীলাব্জ বলয়ের ভেতরে যাবার একটু চেষ্টা করুকনীলাব্জর পছন্দ ছিলো স্পর্শকসে বলয়ের ভেতরে জলের লহরী শুনতে পেত না, সে লহরীর ওপর ভাসমান জলযানকে দেখতে চাইতো না; সে জানতো এর ভেতরে আকাশ নেই, আকাশ বাইরে, পাখি ও তার গান বাইরেহারমোনিয়ামের বাক্সের ভেতরে সুর নেইসুর ভেতরে তৈরি হতে না হতেই হারমোনিয়ামের গা-মাখা হয় বড়জোর, আর তার কয়েক মুহূর্ত পরেই সে দূরে উড্ডীনবলয়ের ধরতাইয়ের বাইরেএইভাবেই নীলাব্জ ওর কবিতার নিজস্ব অবস্থান খুঁজে নিয়েছিলোযা নতুন কবিতার ঘরানা থেকেও যেমন সরে যায়, তেমনি কৌরবের দ্বিতীয় প্রজন্মের থেকেও

নিজের কাব্যগ্রন্থ সাজিয়ে নেবার সময়েও নীলাব্জ তার কাঠামো, আধেয়, আত্মা, মর্ম – এসব নিয়ে তেমন ভাবেনি, আত্মপ্রকাশকেই প্রাধান্য দিত। প্রথম তিনটি বইয়ের নামেই এই প্রবণতা ধরা পড়ে। পীত কোলাজে নীলাব্জ ওর সে সময়ের লেখালিখির সমন্বয় যা কোলাজধর্মী, ঠিক সিরিজ কবিতা নয়, বরং দীর্ঘ কবিতাগুলি দিনলিপির আকারে টুকরো টুকরো লেখার সমষ্টি। তৃতীয় বই প্রচ্ছদশিল্পীর ভূমিকায় সে যেন তার নিজের প্রচ্ছদশিল্পী হিসেবে অবতীর্ণ হবার কথা জানাতে চেয়েছিল মাত্র। পরের বই স্বপ্রকাশিত, তাই লেখক কতৃক প্রকাশিত

একবার আমাকে বলে একমাসের জন্য একটা কুলিং টাওয়ার বসানোর প্রকল্পে হায়দ্রাবাদ (সম্ভবত) যাচ্ছেগেস্টহাউসের সঙ্গহীন সন্ধ্যাগুলোয় হয়তো কয়েকদিন কিছু লেখালিখি করার অবকাশ পাবেআমি ওকেকুলিং টাওয়ারএর ভূমিকা গঠন-কারিগরির দিক নিয়ে ভাবার উৎসাহ দিইবলি এইসব ভাবনা থেকে একটা কবিতামালা তৈরি করতেনীলাব্জ ফিরে এসে আমাকে এই দীর্ঘ কবিতা পাঠায়আমার কাছেই এটাই নীলাব্জ চক্রবর্তীর শ্রেষ্ঠতম কবিতা, আজোকৌরব অনলাইন ৫২ সংখ্যায় এই কবিতা প্রকাশ পায় (এখানে)কুলিং টাওয়ার ম্যানুয়ালে যেভাবে সেই মিনারের কাঠামো নির্মাণে কথা বলা ছিল, তার থেকেই নীলাব্জ তার নিজস্ব কবিতাভাবনাকে গড়ে নিয়েছিলোএকটি ভাবনার সাথে পাশের ভাবনা বা অনুভাবনার সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছিলোপরে বেশ কয়েকবার আমাকে বলেছিলো – ‘বস, ওই কাজটা করতে পেরে খুব ভালোলেগেছিল। টের পেয়েছিলাম একটা ভারী কিছু করছিগভীর কবিতা

কিছু আগে নীলাব্জর কবিতার ওপর আমার কবিতার নানা প্রভাবের কথা লিখেছিএকজন বিশ্লেষণী লেখক কারিগরি গণিতজ্ঞ বলে, কবিতা সম্পাদনায় অনেকদিন আছি বলেই কোন তরুণতরর লেখায় আমার কবিতার কোন চারিত্রিকতা লক্ষ করলে, হয় আমি নিজের লেখাকে সেই প্রবণতাস্থান থেকে নিজেই সরিয়েছি, নয়তো সেই তরুণতর কবিকে সচেতন করেছিনীলাব্জকে সচেতন করেছি অনেকবারকিন্তু নীলাব্জ এই আলগা প্রভাবটা খুব উপভোগ করতোসে হাসিমুখে প্রত্যেকবারই বলতো – ‘আপনি আমার সবচেয়ে প্রিয় কবি বস, এগুলো তো হবেই একটু’। প্রথম কাব্যগ্রন্থ থেকেই ওর অনেক বইতে আমাকে অনেক গোপন সম্বোধন, আমার কবিতাকে বা তার কাব্যভাষা, ভঙ্গি, লিপিগত বৈশিষ্ট্যের অনেক ক্রস-রেফারেন্সওর কবিতা প্রায়শই যেআপনিকে সম্বোধন করে, সেইআপনিযে আমি তা নিয়ে ধন্দের জায়গা নেই নিয়ে অনেকবার ওর সাথে কথাও হয়েছেদ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থগুলমোহররিপিট হচ্ছে উৎসর্গপত্রেরআপনিআসলে আমি বলেই সেইআপনিকে সে কবিতার মিষ্টত্ব মার্জনা করতে বলা হচ্ছে, যা ছিল আমার এক স্থায়ী অভিযোগপ্রচ্ছদশিল্পীর ভূমিকায়’-এর নাম কবিতা শুরু হচ্ছে এইভাবে – ‘যে যার স্মৃতিলেখা লিখছিস্মৃতিলেখাআমার চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ পঞ্চম কাব্যপ্রকল্প, যে বইটা নীলাব্জর অনবরত তাগাদা ছাড়া প্রকাশ পেত নাপরে আবার এক জায়গায় লিখেছেঢুকে পড়ছে লেখার পাতায়/ ওভারল্যাপিংএইওভারল্যাপিংশব্দটা ওর কবিতায় একাধিকবার এসেছেশুধু কবিতায় সাধ করে ডেকে আনা ভালোবাসা ও কদরের ওভারল্যাপিং নয়, অন্যান্য বেশ কিছু ওভারল্যাপিং আমাদের ব্যক্তিগত জীবনেও ছিলআমার জন্মদিনের ঠিক ১৩ বছর একদিন পর নীলাব্জর জন্মদিনফলে প্রতি বছর একইদিনে আমি আর নীলাব্জ একে অন্যকে শুভ জন্মদিন জানাতামআমার কবিতার অনুপ্রেরণায় কখনো কখনো যতিচিহ্নকে আর্টের মতো ব্যবহার করেছে, সরাসরি বাংলা-হিন্দি গানের লাইন কবিতার মধ্যে নিয়ে এসেছে, এনেছে গাণিতিক সমীকরণচিহ্ন কারিগরি প্রযুক্তির তত্ত্বস্মৃতিলেখাবইয়ের একটা অধ্যায়ে আমি আমার পুরনো বাড়ির ছাদকে কেন্দ্র করে একটা ছোট গল্প লিখি, কবিতার ভেতরেসেই গল্পে আমাদের সেই পৈতৃকবাড়ির ভেতরের কিছু স্থিরচিত্র ছিলবাস্তবস্থানের স্মৃতির কিছুটা নিয়ে এক কল্পিত কাহিনী, তার মধ্যেই বসানো বাস্তব স্থানের ছবিযেন কোনটা বাস্তব, কোনটা স্মৃতি, কোনটা কল্পনাআলাদা না করা যায়অনুপম রায় তারসময়ের বাইরেবইতে চমৎকারভাবে এই টেকনিকের সাহায্য নিয়েছিলো এক জায়গায়বাড়ির উঠোনের ছবি ব্যবহার করেছিলো যেখানে সাদাকালো ছবির ভেতরে দেখা যায় এক রঙিন বাসন্তী-রঙা টেনিস বলনীলাব্জও তার গদ্যে এই টেকনিকের অভিনব ব্যবহার রাখেবাড়ির ছাদে বাবা-মেয়ের কথোপকথন চলে এই গল্পের এক জায়গায়আর সেখানে নীলাব্জ একটা স্থিরচিত্র রেখেছিলো একটা বড় প্লাস্টিকের চেয়ারের মুখোমুখি রাখা এক ছোট চেয়ারদুটো চেয়ারই খালিযেন এরাই কথোপকথরত বাবা-মেয়েএইসব আদর-আহরণ সত্ত্বেও নীলাব্জ তার নিজের কবিতার যে স্বতন্ত্রকোণ নির্মাণ করে নিয়েছিলো সন্তর্পনে, সেটা কৌরব অনলাইনে কৌরব পত্রিকায় এপর্যন্ত প্রকাশিত ওর ষাটাতিরিক্ত কবিতায় প্রমাণ ছাড়াও নীলাব্জ আমার কাছে রেখে গেছে আরো অনেক কবিতা তার তারতম্য, যা প্রকাশিতব্য       

তরুণতর বহু কবি, চলচ্চিত্রি, গণিতজ্ঞের সাথে আমার যোগাযোগ ও বন্ধুত্ব। এদের অধিকাংশের ভালোবাসা ও সম্মান চিরকাল পেয়ে এসেছি। কিন্তু খুব ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব তেমন গড়ে ওঠেনি (হয়তো নিজের অসামাজিকতার দোষেই)। নীলাব্জ ছিল এর অন্যতম ব্যতিক্রম। নীলাব্জ যেভাবে আমায় শর্তহীন ভালোবাসতো, আমার অতি নিরীহ, ঘটনাহীন জীবনের নানা পর্ব নিয়ে এত কৌতূহলী, আগ্রহী ছিল আর কেউই নয়। আমার জন্ম, বড় হওয়ার ইতিহাস, পড়াশোনা, স্কুল কলেজ, আমার শ্যামবাজারের মামারবাড়িতে কাটানো শৈশব, কৈশোরের নানা স্মৃতি; বইপড়ার, নাটক, সিনেমা দেখার, খেলাধুলো করার ইতিহাসের পুঙ্খানুপুঙ্খ সে জেনে নিত। গুগল আর্থ ব্যবহার করা শিখে নীলাব্জ একদিন আমার সিনসিন্যাটির বাড়িটাও দেখে নিয়েছিলো। সে বাড়ির বাগান নিয়ে নিয়ত প্রশ্ন করতো আমায়। আমাদের পারস্পরিক ‘ওভারল্যাপিং’-এর গবেষণায় সে চিরসক্রিয়। এইভাবে একদিন সে আবিষ্কার করলো যে আমাদের দুজনেরই প্রথম কবিতা বেরিয়েছিলো যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিগরি ছাত্রদের পত্রিকা ‘ছায়াপথ’-য়ে। কিছুটা উত্তেজিত হয়ে সেদিন আরো বলেছিলো, ‘জানেন, অনুপম রায়েরও প্রথম লেখা ওখানে ছাপা হয়’। এত ঘনিষ্ঠতা সত্ত্বেও নীলাব্জ আমাকে ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’ করেনি। বহুবার আমি তাকে বলেছিলাম, ‘নীলাব্জ, তোর বয়সী সমস্ত বন্ধু-বান্ধবী আমাকে ‘তুমি’ বলে। একটি ব্যতিক্রমও নেই। এমন করিস কেন? ‘তুমি’ হলে সমতা আসে, সমসাময়িকতা আসে, তাই না?’। কিন্তু নীলাব্জ ওই একধাপ কিছুতেই উঠবে না।

আমার নিজের কবিতা, বিশেষত বইপ্রকাশের ব্যাপারে নীলাব্জর কাছে কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই। বাংলা কবিতা জগতে খুব ভাগ্য করে জন্মালে এমন হয় যে জীবিত অবস্থায় তরুণতররা অগ্রজের বইপ্রকাশের ব্যবস্থা করে, সম্পাদনা করে। এ ব্যাপারে আমি অনুজ, অনুজা কয়েকজনের কাছে চিরকৃতজ্ঞ – শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়, জয়শীলা গুহবাগচী ও নীলাব্জ চক্রবর্তী। আমার তৃতীয় বই প্রিন্ট-অন-ডিমান্ড বা চাহিদামুদ্রণ ধারায় প্রকাশিত প্রথম বাংলা কবিতার বই। ২০০৭ সালে বেরোয়। ৩-৪টি কিস্তিতে ছাপা হয় গোয়ার একটি ছাপাখানা থেকে। প্রথম কিস্তির এক কপি কিনে নীলাব্জ আমার কাছে রীতিমতো অভিযোগ করে বেশ কিছু সাম্প্রতিক কবিতা আমি বই থেকে বাদ দিয়েছি বলে। সেসব কবিতার পঙক্তি সে স্মৃতি থেকে বলতে থাকে। তখন আমার মনে পড়ে যায় এবং সেসব কবিতা ল্যাপটপ বা স্টোরেজ ডিভাইসে খুঁজে পাইনা প্রথমে। অনেক অনুসন্ধান প্রয়াসের পর তাদের পাওয়া যায়। পরের মুদ্রণকিস্তিতে সেসব কবিতা বইতে যোগ করি। একইভাবে সে ‘স্মৃতিলেখা’ বইটার দ্বিতীয় প্রকাশের গোটা প্রুফ দেখে দিয়েছিলো দুবার, সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায়। প্রায়ই আমায় সে বলতো, ‘আপনার বই আমি দুটো করে কিনি। যদি একটা হারিয়ে যায়, কেউ নিয়ে গিয়ে যদি ফেরত না দেয়’।                                   

কবিতা কারিগরি গণিত - এই দুই জীবনে আমার যোগাযোগ বন্ধুত্ব হয়েছে চৈনিক ভাষা সংস্কৃতির (ম্যান্ডারিন, ক্যান্টনিজ, হাক্কা প্রভৃতি) অনেক মানুষের সাথেএরা প্রায় সকলেই আমার অনুজ এবং মূল চিন দেশ ছাড়াও হংকং, তাইওয়ান উদ্ভূতএঁদের অনেকের মুখ থেকে শুনেছি, তাদের মৃত্যুচেতনার কথাচৈনিক সংস্কৃতির মূলধারায় মৃত্যুর সংজ্ঞাটা ভারতীয়দের চেয়ে, বা হিন্দু মৃত্যুর সংজ্ঞার চেয়ে অনেকটা আলাদাশোক তাঁদের গ্রাস করেনা আমাদের তোআবার আত্মা অবিনশ্বরতার কথাও তাঁরা মানেন না। তাঁরা মনে করেন দৈহিক মৃত্যুর অনেক পরেও মানুষ বেঁচে থাকে  সে মারা যায় তখনই, যখন জীবিত কোন মানুষের স্মৃতিতেই আর তার অস্তিত্ব নেই, যাতায়াত নেইএই চৈনিক হিসেবে, কৌরব অনলাইন আমার জীবনে, নীলাব্জ চক্রবর্তী মারা যায়নি, তার দেহাবসান হয়েছে মাত্র। সে কোনোদিন অতীত হবে না                               

আর্যনীল

শীত, সিনসিন্যাটি, ২০২৫

           ||     ||    ||    ||