কুণাল বিশ্বাস

 

 

মরূদ্যান 

 

রাত্রি না শিশির আমি ঠিক কাকে চাই

ভরা লোকালয় ধাঁধার মোড়কে আছি

এই ছায়া ঝুরো ঘাস দাহ্য সমতট

চকিত আগুন লাগে, কণ্ঠীদল, দিনভর গান

গাছ দূরে থাকে, সোনাঝুরি কার হাতে 

দেশলাই কাঠি দেয়, রয়েছে বিস্তৃত সুবাতাস

ভর হয়ে এল যে বসন্ত, টের পেল আপামর

মাঠ, পাখি, গম 

 

শূন্যতা ঘরেই থাকে, ঘর অসমান 

সেখানে গোপন খুদ তাতানো উনুন হোক যতই সজাগ

আসলেই একা পড়ে, অগ্নি তার চোখদান করে

মৃত্যুর সামান্য আগে ঘরের বিড়াল হেন কেউ

ঘর ছেড়ে দূরে যায়, দূরে খুব বেগুনচারায়

সুবিধা বাতাস নেই, অকস্মাৎ ওত পেতে আছে

সায়া অপরূপ, নানাবিধ টিপ, সমগ্র শিফন 

 

 

 

(সূত্র: জেনেসিস, মৃণাল সেন)

 

 

 

মহড়া 

 

পাখির গানের কথা আজ শুধু পাখিরাই জানে 

গরম চায়ের কাপ,ডালমুট, ধোঁয়া 

কাপড়ে শ্রমের গাঢ় দাগ লেগে আছে 

বীমা যোজনার কথা ভুলে

তামাক চেয়েছে যারা বুড়ো গমচাষী

বাদামি হুঁকোয় ভরে জল 

 

আকাশে মেঘের ঘোড়া ছুটে সরে যায়

ছুটির খবর আসে ঘুরে 

 

বাতাবিফুলের রোদ যেমন শীতের 

ছেঁড়া লাল তোষকের ঘুম

বেতারে হারানো সুর আর কিছু অনুরোধে গান

খোলে স্রোত, ভেজা আমকাঠ

বাতাসে ভোরের খোঁজে ভূগোলের নদী

 

 

(সূত্র: উত্তরা, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত)

 

 

 

 

শিরোমণিপুর 

 

দুপুরের ঘাট চাই। বাঁধানো ঘরের হাতপাখা, বুনোকুল বাটিতে সাজানো, কালো হাতঘড়ি। দশমহাবিদ্যার মলাটে আঁকা দেবী নেমে এসেছেন বনে। তাঁকেও চাই না। মনে করে পকেটের মুড়ি জলে ছুঁড়ে দিলে কিছু মাছ উঠে ভেসে থাকে।

 

জেনিফার ওদেরই কেউ।

 

ঘর থেকে, বাবা ও মায়ের থেকে, বিয়ে করা ভাই ও তোড়া নাম ভাইজির খেলা থেকে এই সিঁড়িগুলি ভালো ও দূর। হাঁসেরা পড়ছে নীচে, এক-দুয়ে ফসল তুলেছে। যত সুখ ঠোঁটের ডগায়, পিঠে উঠে ভয় কারও মনে। এখন আবার হাওয়া, ঝুরোশাল, আরও এক রেখা। 

 

ঘাটের সাক্ষাতে জল বড়ো হয়ে আছে

 

 

 

(সূত্র: সিগাল এগস, আব্বাস কিয়ারোস্তামি)

 

 

 

আশাবরী   

 

আকাশে গড়ানো শাদা মেঘের দখলে

আবারও জ্বেলেছে বাতি রাতভর কোঠা

আমি আর ঘুমোতে পারিনি

 

ফরাসের থেকে সুতো এনেছি মলিন 

দরোজায় মাথা রেখে গান

জল খেলে কাচের গেলাসে

মদিরাও সখ্য চায় খালি 

দেখো আমি নূপুর নিক্কনে সারারাত

খুঁজে গেছি কাকে

 

সে কি ভুল ঝুমুর দিবসে ওড়া সবুজ ফসল

মেঘ জানে তোমার অতীত

ছুরিকার লাল রঙ মৃত্তিকায় লীন

আশাবরী রাগ আজ বৃথা আগন্তুক

 

 

 

(সূত্র: সিদ্ধেশ্বরী দেবী, মণি কাউল)

 

 

 

পোয়াতির গান

 

খুদে এ সাবান নিয়ে কী করি নতুন

হায় রে দুপুর লাগে   ঘাট দ্বিপ্রহর

অর্থাৎ সাবান ক্ষয়ে যাবে   এখনও অর্ধেক বাকি

যথা দিনাবসানের ডাক

 

কবেই গিয়েছি নদী   ভরপুর স্রোত  নদী গুঞ্জরন

ওর সকাল রঙিন    মন্থরতা ওকে নদী করে

সোজা দাগ বেঁকে ছিল বিবাদে ও রোদে

আর উৎসে ফেরার তুমুল টান    গঙ্গোত্রীও ডাকে

 

এই ঘাসজমি ছেঁটে দানব কিশোর

রাতভর খেলে হাওয়ায় ভাসায় লেজ

একদা সে, ধরো গেলজন্ম, রাখাল হয়েই ছিল

বাঁশি ও শৃঙ্গারে দড় ছিল এ তল্লাটে

ছোপানো হলুদ ওর মুখ

মুখে টানা অনেকের চোখ, মুখে হাসি পরপর

 

আলাপ ইশারা হয়      হাতে হাত চুড়ি

কঠিন পাথর থেকে জাগে যদি জলাশয় প্রিয় 

জন্ম নেয় মাছ

মীনগন্ধে সরু নীল সন্তরণ পথ, ঘুমের ভিতরে ঘুম

অন্ধছাদ পাতাপড়া সকালের অপেক্ষায় বাজে

 

 

 

(সূত্র: দুবিধা, মণি কাউল)

 

 

 

কুণাল বিশ্বাসের জন্ম কবি বিনয় মজুমদারের স্মৃতিপুষ্ট ঠাকুরনগরেকারিগরী বিদ্যায় স্নাতক, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পূর্ত দফতরে কর্মরত। প্রিয়: কলনবিদ্যা, স্বদেশ সেন, রাহুল দেববর্মণ ও পশ্চিম ইয়োরোপীয় চিত্রকলা। এই সময় কাগজে রিপোর্টাজ, কৌরব অনলাইন, এই সহস্রধারাহাওয়া ৪৯ পত্রিকায় গল্প, ভাষালিপি, সর্বনাম, অহিরা কবিয়াল পত্রিকা এবং চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম, আপনপাঠ, চলভাষ, যাপনচিত্র,প্রভৃতি পত্রিকা ও ওয়েবজিনে কবিতা প্রকাশিত। কবিতার বই: ভ্যান গঘের প্রিয় রঙ (ভাষালিপি)।