শিবাংশু মুখোপাধ্যায়ের গদ্য

 

শিবাংশু মুখোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৭৫)। ভাষাতত্ত্বের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইনস্টিটিউটে জুনিয়র ও সিনিয়র রিসার্চ ফেলো। পিএইচডি কল্যানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পরে খড়গপুর আইআইটিতে। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য প্রযুক্তি ও বৈদ্যুতিন দপ্তরের অধীনে ভাষা প্রযুক্তি গবেষণা পরিষদ-এর সাথে যুক্ত। জার্মানির কনস্টানজ বিশ্বিদ্যালয়ে দু-বার রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট হিসেবে পরিদর্শন করতে। পড়িয়েছেন কল্যানী বিশ্ববিদ্যালয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য জায়গায়। প্রথম উপন্যাস ত্রিকোণমিতি (কথা ও সাহিত্য, ২০১৬)। প্রথম গ্রন্থ বৈচিত্র্যে ও বিপন্নতায় ভাষা (বাণীশিল্প, ২০২০)।

image003

 

কিন্তু,কথাটা জরুরি

 

[১]

এই পর্বে আমরা বসতে চেয়েছি, আটপৌরে বাংলায় ব্যবহৃত কিন্তু শব্দটাকে নিয়ে। প্রথমেই যে জরুরি বার্তা পেশ করা দরকার সেটা হল, সন্দর্ভ কণিকা বা ইংরিজিতে যাকে ডিসকোর্স পার্টিকেল বলে, তার চরিত্রের ব্যাখ্যায় বলা হয় এদের চরিত্র অনেকটা ক্রিয়া-বিশেষণের মতো। বাংলায় প্রায় তেরো-চোদ্দটা কি তারও বেশি কণিকা আছে (আমি সব ক্ষেত্রেই কণিকা কথাটা ব্যবহার করি যাতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তাদের নিয়ে আলোচনা করা যায়। কারণ সব কণিকাকেই সন্দর্ভ কণিকা বলা যাবে কিনা - সে ব্যাপারে আমারও সন্দেহ আছে!)। আমি সেইসব কণিকার চরিত্রের ঢালাও বিবৃতি দিয়ে তাদের সবার জন্য সাধারণ সূত্র নির্মাণ করতে চাই নি কখনো।

 

খুব ওপর-ওপর দেখলেও বোঝা যায়, এই কিন্তু, বাংলা ভাষায় প্রধানত দু-রকমের। এক হচ্ছে, যখন কিন্তু দুটো আপাত পরস্পর বিরোধী মানেওয়ালা বাক্যাংশ (বা উচ্চারণ)-কে জুড়ে দেবার কাজ করে, যেমন; অঘোরবাবু এমনিতে খুবই ভালো লোক কিন্তু তাঁর সাংঘাতিক জুয়ার নেশা। অর্থাৎ যেন প্রথম বাক্যাংশের মূল ভাবের অংশ থেকে ওই কিন্তু দিয়ে জোড়া দ্বিতীয় বাক্যাংশ খানিকটা ভাব বিয়োগ করে দিচ্ছে। যেমন, এবং-এর ক্ষেত্রে কাজটা ছিল যোগের: অঘোরবাবু এমনিতে খুবই ভালো লোক এবং তিনি নিয়মিত সন্ধেবেলায় সঙ্গীতচর্চা করেন। এখানে বক্তা এবং অঘোর বাবুর ভালোমানুষীর ধারণাসম্বলিত প্রথম বাক্যাংশের সঙ্গে তাঁর সঙ্গীতচর্চা গুণ সম্বন্ধে বাড়তি তথ্য যোগ করে দিচ্ছে দ্বিতীয় বাক্যাংশে, শ্রোতার জন্য। কিন্তু কিন্তু বেলায় ঘটেছে উলটোটা। বাক্যের প্রথম অংশে অঘোরবাবু ভালো লোক এই তথ্য দেবার পর শ্রোতার মনে সেই সম্পূর্ণ তথ্যের মধ্যে দিয়ে যে ভাব উৎপন্ন হয়েছিল তার থেকে খানিকটা কেটে বাদ দিচ্ছেন বক্তা দ্বিতীয় বাক্যাংশ, কিন্তু তাঁর সাংঘাতিক জুয়ার নেশা, এই কথা বলে। তাই প্রথাগত বাংলা ব্যাকরণে এবং-কে বলা হয়েছে সংযোজক অব্যয় আর কিন্তু-কে বলা হয়েছে বিয়োজক অব্যয়।

 

বাংলা ভাষার আটপৌরে চেহারাতে, দ্বিতীয় রকম কিন্তু-র নিয়মিত দেখা মেলে। অবশ্য - তৃতীয়, চতুর্থ, কিংবা আরও অনেক রকম কিন্তু-র দেখা মেলে কিনা সে কথাও এই রচনায় বিবেচ্য। তবে শুরুতেই সেই অন্বষণের চেষ্টা চালালে পাঠক বিভ্রান্ত হবেন। সেটা কাম্য নয়। কথোপকথনে যেমন শ্রোতার ভূমিকা, তেমনই পাঠ্যে পাঠকের ভূমিকা। এই রচনায় এসব কথাও আসবে উপর্যুপরি। কিন্তু তার জন্য লাগবে আরেকটু অপেক্ষা। দ্বিতীয় রকম কিন্তু বাংলায় বিয়োজক অব্যয় হিসেবে কাজ করে না। কিন্তু কিন্তু শব্দটার ইতিহাসের মধ্যেই যেন কোথাও একটা বিয়োজন-এর কাহিনী লেখা হয়ে আছে। তাই সরাসরি দুই বাক্যাংশের মধ্যবর্তী বিয়োগসূত্র হিসেবে কিন্তু কাজ না-করলেও, কিন্তু উচ্চারণের যেখানেই ব্যবহৃত হোক না কেন, সে তার চরিত্র অনুযায়ী সেই উচ্চারণে পূর্ববর্তী উচ্চারণের বা পরিস্থিতি মূল ভাবনা-স্রোতের মধ্যে একরকম বিয়োজন-মূলক অভিব্যক্তিই ফুটিয়ে তোলে। ধরা যাক, আপনি মার্কসবাদীদের সভায় গিয়ে বলে বসলেন, আমি কিন্তু মার্কসীয় তত্ত্বকে বিজ্ঞান বলে মানি না। আপনার ওই উচ্চারণের কিন্তু, ওই দ্বিতীয় প্রকার কিন্তু। এখানে কিন্তু-র কাজ হল, আপনার উচ্চারণের মাধ্যমে সভার ভাব, গতি ও ছন্দের প্রকরণের বৈপরীত্য তৈরি করা। কিন্তু এই বৈপরীত্য বা বিয়োজন প্রথম প্রকার কিন্তুর মতো সপাটে বলার নয়। এই দ্বিতীয় প্রকার কিন্তু-র মধ্যে একধরনের ইতস্তত বা আমতা আমতা করে বলার ভাব থাকে। বা বক্তা এই দ্বিতীয় কিন্তু দিয়ে বেঁকিয়ে তার মত প্রকাশ করার সুযোগ নেন। এই অবধি বলে, আমরা একবার দেখে নেব, বাঙালির সংস্কৃতিতে কিন্তু শব্দটার ওজন কতটা। সংস্কৃতির সাপেক্ষে এই ওজন মাপার কাজটা যে অভিধান করে - সেকথা বোধহয় সকলেরই জানা।

 

কিন্তু নিয়ে জ্ঞানেন্দ্রমোহনের বক্তব্য এই যে, কিন্তু বিয়োজক অব্যয়, প্রাকৃত বাংলায় যা ছিল, কীন্তু, যা পাওয়া যাচ্ছে ১১৬৫ সালের দলিল থেকে। এই কিন্তু-র প্রায়-সমার্থক শব্দ, পরন্তু বা অথচ। এছাড়াও তিনি বলছেন, পূর্ব্বোক্তির বৈপরীত্য কথনে পূর্ব্ব-প্রস্তাব বা যুক্তির খণ্ডন অর্থে কিন্তু ব্যবহৃত হয়। দ্বিতীয়ত, তিনি কিন্তু-র প্রাদেশিক অর্থের দিকেও তাকিয়েছেন। সেখানে কিন্তু ক্রিয়া-বিশেষণ হিসেবে সঙ্কুচিত বা জড়সড় - এই অর্থ বহন করে। কিন্তু-র এই প্রাদেশিক ব্যবহারের দৃষ্টান্ত হিসেবে তিনি গিরিশ ঘোষের প্রফুল্ল নাটক থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন: মা তুমি কিন্তু হয়ে বলছ কেন? যাকে সঙ্গে নিতে হয় নাও যা ইচ্ছে হয় বল। বাবার কিছু করতে পারিনি তুমিও এখন কিছু ভার দেওনি, তুমি কিন্তু হলে আমার মনে দুঃখ হয়। সাদামাটা হিসেবে জ্ঞানেন্দ্রমোহনের প্রাদেশিক কিন্তু-র ব্যবহার ক্রিয়া-বিশেষণের। কিন্তু একথাও বলা যায়, এই অর্থে কিন্তু - একরকম নামকরণেরও কাজ সেরে নেয়। কোনো ব্যক্তির কোনো বিশেষ অবস্থাকেও কি এই প্রাদেশিক কিন্তু দিয়ে বোঝানো হচ্ছে না? তাহলে সেটা চরিত্রগতভাবে ক্রিয়া-বিশেষণ হচ্ছে কী করে? ক্রিয়া-বিশেষণ হিসেবে তার রূপান্তর ঘটতেই পারে। ধরা যাক, আমি কাউকে রেগে বললাম, তুমি ন্যাকামি করো না তো! তুমি ন্যাকা ভাব করলে আমার রাগ ধরে। এখানে ন্যাকামি কি ক্রিয়া বিশেষণ? নাকি ওইখানে কিন্তু আরও অন্যরকম কিছু করে?

 

[২]

প্রথম প্রকার কিন্তু নিয়ে কারুরই কোনো সমস্যা নেই। মৌখিক থেকে লিখিত, আটপৌরে থেকে আনুষ্ঠানিক - সবরকম বাংলাতেই বিয়োজক অব্যয় হিসেবে কিন্তু-র ব্যবহার দাপটে চলে। সেখানে কিন্তু, অথচ-রই সমগোত্রীয়। সমস্যা হয় বুঝতে ওই দ্বিতীয় প্রকার কিন্তু-কে। কোনো উচ্চারণে যখন ওই দ্বিতীয় প্রকার কিন্তু কর্তার ঠিক পরের জায়গাটাতেই (বেশিরভাগ ওইটাই তার পছন্দের জায়গা) বসে, তখন উচ্চারণের অভিপ্রেত মানে তো কথোপকথনে অংশগ্রহণকারী শ্রোতামাত্রই বুঝে নেন, কিন্তু অসুবিধায় পড়ি আমরা যারা কিন্তু-র ওই বিশেষ অবস্থানকে ব্যাখ্যা করতে চাই। কেবলমাত্র কিন্তু-র ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ নয়, আমরা এখানে যেটা বুঝতে চাইছি সেটা হল, ভাষার বিপুল বিশ্বে - এই অকিঞ্চিতকর শব্দটি ব্যবহার করে বাঙালি (সব রকমের বাঙালি কিনা জানি না অবশ্য) তার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে কোনো বিশেষ ভূমিকা পালন করে কিনা! আর বর্তমান আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটেও এই কিন্তু-র কোনো বিশেষ ভূমিকা আছে কিনা - যা দিয়ে একজন বক্তা সমস্ত ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলতে পারেন! সহজ করে বুঝে নিতে প্রথমেই নিচের বাক্যদুটো খেয়াল করা দরকার, যেখানে একটা উচ্চারণ কিন্তু ছাড়া, আরেকটা কিন্তু সহ।

 

(১)

ক। আমার খিদে পেয়েছে।

খ। আমার কিন্তু খিদে পেয়েছে।

 

(১খ)-এর বাক্যের দিকে চোখ রেখে আমরা দুটো কথা বলতে চাইছি। এক, কিন্তু-র স্বতন্ত্র যে মানে অর্থাৎ পদ হিসেবে কিন্তু-র যে মানে তা যদি (১ক)-এর প্রত্যেক পদের স্বতন্ত্র মানের যোগফলের সঙ্গে আবার যোগ করে সামগ্রিক যোগফল হিসেবে দেখাতে চাই - তাহলে তা থেকে (১খ) বাক্যের মানে পাওয়া যাবে না। (১খ)-এর প্রত্যেক পদের মানে তার স্বাতন্ত্র বজায় রাখে নি বক্তার ওই বাক্য উচ্চারণের সময়। (১খ)-এর তাৎপর্য বুঝতে গেলে তাই, প্রথমত সামগ্রিক বাক্যের দিকে তাকাতে হবে, দ্বিতীয়ত; সেই বাক্য যে সামাজিক পরিস্থিতিতে ব্যবহৃত হচ্ছে তার দিকেও তাকাতে হবে এবং যেহেতু সেই পরিস্থিতি নানারকম হতে পারে সেহেতু (১খ)-এর ভাষ্যও নানারকম হবে, তৃতীয়ত, খেয়াল রাখতে হবে বক্তার মেজাজের দিকে এবং সেই সঙ্গে শ্রোতার প্রতি বক্তার যে আগাম বোঝাপড়া সে-দিকেও। চার; (১খ)-কে এই ক্ষেত্রে (১ক)-এর ছায়াবাক্য হিসেবে দেখানো হলেও, প্রত্যেক উচ্চারিত বাক্যের ক্ষেত্রেই কথোপকথনের যাবতীয় সূত্র খেয়াল রাখতে হবে।

 

আমাদের হয়তো খেয়াল করা উচিৎ ছিল, (১খ) আসলে একটা উত্তর বা প্রত্যুত্তরের মতো, একটা বিরাট ঘটনার ক্ষুদ্রতম অংশ। এরকম একটা পরিস্থিতি কি কল্পনা করা যায় না - যেখানে নিখিল আর দিলীপ নবদ্বীপে ভর-দুপুর বেলা নিমাইয়ের বাড়ি খুঁজে বেড়াচ্ছে। খোঁজার কাজ চলছে সেই সকাল থেকে। কেউ বলতে পারছে না নিমাইয়ের বাড়ি কোথায়। নিমাইকে তার কোম্পানি একদা ছাঁটাই করেছিল। নিমাই হতাশায় ভুগে বড় অসুখ বাধিয়েছিল। এখন নিমাইকে কোম্পানি আবার কাজে বহাল করতে চাইছে। সেই খবর দিতেই নবদ্বীপে আগমন নিমাইয়ের দুই সুহৃদ সহকর্মী বন্ধু লিখিল আর দিলীপের। যখন এদিক-সেদিক ঘুরে দুজনেই ক্লান্ত তখন নিখিল দিলীপকে বলছে,

 

(২) দিলীপদা চলো, এবার রেললাইনের ওপাশটা খুঁজে দেখি!

 

এই (২)-এর উচ্চারণের পর (১খ)-এর বাক্য ব্যবহার করছে দিলীপ। এখন নিমাইয়ের সঙ্গে নিখিল ও দিলীপের সম্পর্ক, নিমাইয়ে চাকরি যাবার ইতিবৃত্ত, নিখিল ও দিলীপ - সেই মুহূর্তে দুজনের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা - এই সমস্ত কিছুর প্রতিফলন রয়েছে ওই (১খ)-এর বাক্যে। যদি এই কাল্পনিক পরিস্থিতিটা সত্যি হয়। যদি না হয়, তাহলে (১খ)-এর ব্যাখ্যা আবার অন্যভাবে দিতে হতে পারে। অতদূর না গিয়েও বলতে হয়, আমার কিন্তু খিদে পেয়েছে-র মধ্যে দিয়ে আসলে কি দিলীপ কেবল তার খিদের অনুভূতিই ব্যক্ত করতে চেয়েছে? এই মুহূর্তে এটা তো পরিষ্কার যে লিখিত উচ্চারিত বাক্য (২)-এর সঙ্গে কার্য-কারণ সূত্রে (১খ) আবদ্ধ নয় বা (১খ) দিয়ে দিলীপ যা বোঝাতে চাইছে বা (১খ)-এ যে মানে নিহিত আছে তার সঙ্গে (২)-এর সরাসরি কোনো যোগ নেই।

 

 

 

[৩]

ঠিক এই জায়গাতেই বলা দরকার পল গ্রাইসের কথা। পল গ্রাইস ইমপ্লিকেট বলে একটা ক্রিয়াপদ ব্যবহার করেছেন, যার বাংলা করা যায় সংশ্লিষ্ট করা - তার থেকে তিনি ইমপ্লিকেচার (ইমপ্লাইং-এর সঙ্গে তুলনীয়) এবং ইমপ্লিকেটুম (যা যা ইমপ্লাই করা হচ্ছে বা সংশ্লিষ্ট বা নিহিত বস্তু - এই ভাবের সঙ্গে তুলনীয়) - এই দুটো শব্দের উল্লেখ করেছেন। ওই দুটো শব্দ উল্লেখ করার কারণ হিসেবে তিনি দেখিয়েছেন যে, ইমপ্লিকেট ক্রিয়ার যা স্বাভাবিক বৃত্তি তার থেকে বের করে এনে বক্তব্যকে আরও বিশেষ অর্থে প্রয়োগ করাই তার উদ্দেশ্য। তিনি জানতেন, এই কথোপকথনের প্রেক্ষিতে ইমপ্লিকেট-এর মধ্যে যে অনুমান-নির্ভর এক বোঝাপড়ার কথা রয়েছে সেই সরল সমীকরণ থেকে আসলে তাঁকে সরে আসতে হবে।

 

ইমপ্লিকেচারের বাংলা কী করব তা ঠিক করতে না পেরে আপাতত ওই নামেই ডাকছি। ইমপ্লিকেচার বলতে দু-ধরনের জিনিসের যে কোনো একটাকে বোঝায়: (১) এক কথা বলে অন্য কথার মানে বোঝানো বা তার সংশ্লিষ্ট ভাব ব্যক্ত করা এবং (২) সেই এক কথার আর-এক মানে বোঝানো বা তার সংশ্লিষ্ট ভাব ব্যক্ত করার লক্ষ্যবস্তু। ইমপ্লিকেচার কাজ করে মূলত কোনো কথোপকথনের প্রেক্ষিতে। এই ইমপ্লিকেচারের ভূমিকা আমাদের আটপৌরে ভাষায় সাংঘাতিক। ইমপ্লিকেচারের মাধ্যমে মানুষ একে-অপরের সঙ্গে কেবল সংলাপ চালাতে পারে তাই-ই নয়, সুস্থ সামাজিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে পারে, অশ্বত্থামা হত ইতি গজ-র মতো মিথ্যে না বলেও সত্যকে আড়াল করতে পারে। আর এই প্রত্যেকটা ক্ষমতা কোনো ভাষার বক্তার আপনা-আপনিই থাকে। আপনা-আপনি বলতে আমি জন্মগত বলছি না। শেখা বা অভিজ্ঞতা-র মাধ্যমেই বক্তা তার নিজের ভাষায় ইমপ্লিকেচার ব্যবহার করতে ও অন্যের ব্যবহার করা ইমপ্লিকেচারের মানে বুঝতে পারে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই। বক্তা-শ্রোতার এই অনায়াস অর্জনের ক্ষমতা অবশ্য তার জন্মসূত্রেই পাওয়া। তবে ইমপ্লিকেচার ব্যবহার করার জন্য তাকে আলাদা কোনো কৌশল শিখে নিতে হয় না। গ্রাইসের হিসেবে এই ইমপ্লিকেচার দু-ধরনের হয়, গতানুগতি এবং ব্যতিক্রমী। সাধারণত, ভাষায় এমন কি নিত্য আটপৌরে কথোপকথনে অলঙ্কারের ব্যবহার এই ইমপ্লিকেচারের একটা খুব চেনা দৃষ্টান্ত। যেমন, আমার বাবার কোনো নিষেধ ছোট বেলা থেকে অগ্রাহ্য করে এসে আমি বড় হয়ে যখন বলতাম, এবার থেকে ঠিক করব, ইত্যাদি, তখন বাবা বলতেন, নয়ে না নুইলে বাঁশ, বাঁশ করে ট্যাঁশ ট্যাঁশ। এর সহজ কথায় আমার মনে প্রতিক্রিয়া হত, ন-মাসেও যে বাঁশ (আক্ষরিক অর্থে) নুইয়ে পড়ে না, সে বাঁশ ভালো (গুণসম্পন্ন) হয় না। এই বক্তব্যের সঙ্গে আদি জ্ঞান ওরফে ইনডিজেনাশ নলেজ কীভাবে জড়িয়ে রয়েছে, সে সম্বন্ধেও বিশদে আলোচনা প্রয়োজন। কিন্তু আমার মনে তৎক্ষণাৎ যে ভাবের উদয় হতো সেটা হল, বাবা আমার এর পর থেকে ভালো হয়ে ওঠার পন্থায় আর বিশ্বাসী নন।

 

কথোপকথন বা আটপৌরে ভাষার ভাষ্য তৈরির ক্ষেত্রে এই ইমপ্লিকেচার, বক্তব্যতত্ত্বের এক অতি-প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। এমন কি, আধেয়তত্ত্ব বা সেম্যানটিক্সেও, ধারণা ও পদ্ধতির আলোচনায় এই ইমপ্লিকেচার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, সেখানেও আটপৌরে কথায় যা অস্তিত্ত্বশীল আর যা সেই কথার মধ্যে দিয়ে সংশ্লিষ্ট হচ্ছে শ্রোতার মননে তার মধ্যে ফারাকটা ঠিক কোথায় সেটা দেখিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। মনে হয়, ভাষার বিবর্তনে এই ইমপ্লিকেচারের একমাত্র সাক্ষী ভাষার প্রবাদ-প্রবচনগুলো।

 

বক্তব্যতত্ত্বের কাজের জায়গা মূলত মানুষের ভাষার আরপৌরে উচ্চারণ। এই উচ্চারণকে কথোপকথন বিশ্লেষণের একক হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু-ওয়ালা যে বাক্যগুলো তুলে ধরছি সেগুলো তো আদপেই এক-একটা উচ্চারণ। লিখে ফেললেই যদিও তা বাক্য হয়ে যায়, তবুও আমি যথাসম্ভব উচ্চারণগুলোকে ঠিক যেমন বক্তাকে বলতে শুনেছি তেমনভাবেই রাখার চেষ্টা করছি। বিজ্ঞানের কাজে প্রমাণসহ দাবী পেশ করার নিয়ম আছে। এই রচনা যেহেতু মূলত বাঙালি পাঠকের কথা ভেবে এগোচ্ছি, সেহেতু এই রকম উচ্চারণ যে বাস্তবিক - সেই কথা আর তাদের প্রমাণ করে দেখাতে হবে না। যদি কখনো এই রচনার ইংরিজি অনুবাদ করা হয় তখন প্রশ্ন উঠবে হয়তো এই রচনার দৃষ্টান্তের প্রামাণ্যতা নিয়ে। তখন ইংরিজি পাঠকদের বা অন্য কোনো ভাষার পাঠককে এইটাই বুঝে নিতে হবে বাংলা ভাষায় যেহেতু এই রচনা প্রথম আত্ম-প্রকাশ করেছিল এবং কোনো বাঙালি পাঠকের তরফে দৃষ্টান্তের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠে নি তখন এই উচ্চারণের বাস্তবতা বিশ্বাস করে নেওয়াই দস্তুর বলে মনে করতে হবে। কিন্তু মুশকিল হবে, এই নিয়ে কোনো বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ লেখবার সময়। তখন, প্রমাণ হিসেবে বাংলা ভাষার এমন উপাত্ত হাজির করতে হবে যেখানে কিন্তু-র এই নানান রকম ব্যবহার নিয়ে মানুষের উচ্চারিত বাক্যের সম্ভার রয়েছে।

 

এখন কাজের কথা বলি। উচ্চারণেও বাক্যের মতো শব্দের পরম্পরা থাকে যা একটা কথোপকথনে কোনো এক ব্যক্তির বা বক্তার যখন বলবার সময় আসে (তার আগে তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়, অন্যেরা কথা বলেন) তখন একটা নির্দিষ্ট স্বরভঙ্গির অবয়বের মধ্যে দিয়ে তাঁর উচ্চারণ ব্যক্ত হয়। একটা উচ্চারণ একটা বাক্যের চাইতে ছোটও হতে পারে। এই উচ্চারণ এক সময় একরকম স্বীকৃত বিবৃতি হয়ে উঠবে যখন কোনো ব্যক্তির পরিচয়, ভাষার নিজস্ব আচরণ, ইত্যাদির আর গুরুত্ব থাকবে না। এই শেষোক্ত বক্তব্যে আমার মত নেই। আমার মত হল একটা উচ্চারণ স্থান-কাল-পাত্রের সাপেক্ষেই বিচার্য হওয়া উচিত। আমি তাই কিন্তু নিয়ে কথা বলবার শুরু থেকেই তাকে কোনো পরিস্থিতিতে নাটকীয়ভাবে প্রযুক্ত করার চেষ্টা করছি। অবশ্য এই উচ্চারণকে পাঠ্য বা টেক্সট বলা হলে আমার কোনো আপত্তি নেই। কারণ টেক্সট আর কনটেক্সটের খুব দোস্তি। এই উচ্চারণ তখনই একটা পাঠ্য হিসেবে বিবেচ্য হবে যখন এই উচ্চারণের আগে এবং পরে বক্তার থামা থাকবে - ওই স্বরভঙ্গি মারফত প্রকাশিত কথাকে সম্পূর্ণ করে তোলবার জন্য। কারুর মতে আবার, উচ্চারণ হচ্ছে, স্থান-কাল-পাত্রের সাপেক্ষে বলাকে লেখার ফল। সেখানে দু-রকমের উচ্চারণ আছে: লিখিত উচ্চারণ এবং মৌখিক উচ্চারণ। মৌখিক উচ্চারণ ক্ষণস্থায়ী আর লিখিত উচ্চারণ দীর্ঘস্থায়ী। প্রতিটা উচ্চারণ যেহেতু একটা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ও পারিপার্শ্বিকতায় জীবন্ত হয়ে ওঠে সেহেতু তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব মানে আছে। যেমন, বাক্য হিসেবে যা অভিন্ন তা উচ্চারণ হিসেবে পরিস্থিতির সাপেক্ষে ভিন্ন হতে পারে। ফলে উচ্চারণের মধ্যেই ভাষার নিজস্ব বাস্তবিক চরিত্র ফুটে ওঠে, বাক্যের মধ্যে নয়। বাক্য আসলে ভাষার একধরণের নির্বিশেষ নির্জীব খোলশ মাত্র। সময় ও বক্তার পরিচয় ও কথোপকথনের অংশগ্রহণকারী অন্যান্য শ্রোতা বা বক্তার সঙ্গে তার মানবিক ও সামাজিক সম্পর্কের নিরিখ ইত্যাদির সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির অবস্থার মধ্যে না পড়লে সেই নির্জীব খোলশ সজীব হয়ে ওঠে না।

 

উচ্চারণের গুরুত্ব হল সেখানেই, যেখানে ব্যক্তি বক্তা পরিস্থিতির মধ্যে থেকে তার ইচ্ছার অনুরূপ কোনো বক্তব্যকে বের করে আনেন। সেই বক্তব্য ভাষার নিয়মমাফিক যোগাযোগ ব্যবস্থার অনুশাসনে পরাধীন নয়। একটা নির্দিষ্ট স্থানে একজন বক্তা এক নির্দিষ্ট সময়ে কোনও বিশেষ উদ্দেশ্যে যা বলতে চাইছেন তাই-ই উচ্চারণ। সুতরাং উচ্চারণে কেবলমাত্র বক্তাকে গুরুত্ব দিলে চলবে না, সেই সঙ্গে পরিস্থিতি, সময়, স্থান ও বক্তার অভিপ্রায় এবং আরও বিশেষ করে সেই উচ্চারণের যাঁরা শ্রোতা তাঁদের সঙ্গে বক্তার মানবিক ও সামাজিক সম্বন্ধের কথাও খেয়াল রাখতে হবে। আপনারা হয়তো ভাবছেন, আমি অযথা জটিল করে তুলছি উচ্চারণের সংজ্ঞাকে। না তা করছি না। কারণ যে যে জিনিস খেয়াল রাখার কথা উল্লেখ করছি, তা আপনারা কথোপকথের সময় নিজের অজান্তেই মনে রাখেন। তাহলে এত সব উল্লেখ করছিই বা কেন! এরকম প্রশ্ন আপনি করতেই পারেন। এর উত্তর হল, যখন অত সব আপনার কাছে উল্লেখ করছি তখন আপনি ওই কথোপকথনের অংশগ্রহণকারী নন। তখন আপনি এই রচনার পাঠক। আপনি বিস্মিত হচ্ছেন, বাবা এতকিছু ঘটে চলে আমাদের রোজকার আটপৌরে কতাবার্তার সময়, এইটাই আমার উদ্দেশ্য। আপনাকে চমকে দেওয়ার কারণ হল, গণতন্ত্রে যখন আপনি নাগরিক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন তখন যেন আপনি নিজের চারপাশের অবস্থা সম্বন্ধে সচেতন থাকেন। ধরুন, কোনো আড্ডায় যখন, আপনি আপনার বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলেন, তখন কি সেই আড্ডার মধ্যে থেকে উঠে আসা বাক্যগুলোর ব্যাকরণসম্মত মানে বের করেন? করেন না! যেমন, ধরা যাক, আপনি খুব বেশি সিগারেট খান এবং মাঝে মধ্যেই বন্ধুদের কাছে কুশলী সমর্পণ করেন, সিগারেট ছেড়ে দেব - এই বলে। তা সেই আড্ডায় যখন আপনার এক বন্ধু আর বন্ধুর কাছ থেকে সিগারেট চাইছেন, তখন আপনাকে উদ্দেশ্য করে সেই বন্ধু বলেন যে ও তো সিগারেট ছেড়ে দিয়েছে, তখন ওই কথার মধ্যে কেবল ব্যঙ্গের সুর বুঝতে পারলেই তো মিটে যাবে না। আপনাকে তখন আপনার নকল সিগারেট ছাড়ার ভঙ্গিমারও যে একটা ইতিহাস আছে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হয়। আবার ওই যে বললাম, দিলীপ বলছে আমার কিন্তু খিদে পেয়েছে - তার একটা পরিস্থিতি এবং বক্তার সেই পরিস্থিতিতে অবস্থান সম্বন্ধেও কথা বলেছি, যদি ওই একই উচ্চারণ অন্য পরিস্থিতিতে অন্য বক্তার মাধ্যমে প্রকাশিত হত, তাহলে ওই একই উচ্চারণেই অভিব্যক্তি অন্য রকম হত হয়তো। সেই কথায় আবার পরে আসব, যখন আরও কিন্তু-সম্বলিত উচ্চারণের নমুনা আপনাদের সামনে পেশ করব তখন।

 

[৪]

কিন্তু-কে বুঝতে গেলে বক্তার চাইতেও শ্রোতার দিকে তাকাতে হয় বেশি। তাই বলে ভাববেন না আমি আদর্শ বক্তা-শ্রোতার সরল ছবিটার দিকে তাকিয়ে কথাটা বলছি। আমার কথায় শ্রোতা, যে-কোনো কথোপকথনেরই প্রধান অংশ। সেখানে বক্তাও আসলে শ্রোতা। কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বক্তার উচ্চারণ আসলে তার পূর্ববর্তী কোনো সদৃশ পরিস্থিতে শ্রবণ এবং ভাষিক বিশ্লেষণেরই সমতুল অভিব্যক্তি। শ্রোতা তো কেবল শোনে না। সে শোনে এবং বোঝে বা উপলব্ধি করে - বিশ্লেষণ ও যাচাইয়ের মাধ্যমে। তাই কথোপকথনে শ্রোতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল, বোঝা বা যাকে দার্শনিক পরিভাষায় বলে পারসেপশন বা উপলব্ধি, অনেকে বলেন বিভাব। বিভাব বললে একটু গুরুগম্ভীর দার্শনিক প্রত্যয় জাগে একথা অনস্বীকার্য। এই উপলব্ধিই হল, জ্ঞান বা চৈতন্যের প্রধান উপাদান। জ্ঞান বা চৈতন্যকেও আবার এক বা বিকল্প সম্পর্কের মধ্যে ফেলা যায় না। কারণ বিশ্বজনীন বিশ্বে - গোলকায়নের একমাত্র ভাষায় জ্ঞানের প্রতিশব্দ নলেজ আর চৈতন্যের প্রতিশব্দ কনসাসনেস। আবার অন্যকিছুও কেউ ভাবতে পারেন। সে যাই-হোক, মোদ্দা কথা হল, শ্রোতার উপলব্ধি। সেখানেই ফিরে যাই কিন্তু-র হাত ধরে।

 

মরিস মেরলো-পঁটির (Maurice Merleau Ponty) মতো করে বলা যায় যে, মানুষের ভাষাকে বুঝতে গেলে তার পরিসর এবং মানের হদিশ খুঁজে দেখতে হয়। মানের শেকড় খুঁজে পাওয়া যায় অভিজ্ঞতার মধ্যে এবং পরিসরের হদিশ পাওয়া যায় বক্তার ইতিহাসের ভেতর। সেই কারণে মেরলো-পঁটি ভাষাকেই কাঠগোড়ায় দাঁড় করান। ভাষার চরিত্রকে তিনি কয়েকটা এককালিক জ্ঞানের চালচিত্রে ধরবার চেষ্টা করেন [দ্রষ্টব্য: সিলভারম্যানের (Silverman) প্রবন্ধ, Merleau-Ponty and the Interrogation of Language (Research in Phenomenology, Volume X)]। মেরলো-পঁটি যাকে উপলব্ধির প্রাধান্য (primacy of perception) বলেছেন, তার মধ্যে তিনি বেশ কিছু সমস্যা তৈরি করেন। সমস্যাগুলো; প্রকৃতি, শরীর, সময়, কলা, ইতিহাস, বস্তু, দৃষ্টিভঙ্গি, ইত্যাদি বিভিন্ন জিনিস নিয়ে হতে পারে। প্রত্যেকটা সমস্যা পরস্পরের সঙ্গে ওতোপ্রত। এই সমস্ত সমস্যার পটভূমিতে যেন ভাষা লিখিত থাকে। ভাষা যেন ওই সমস্যার উপাদানগুলোর ভেতরকার সম্বন্ধের ওপর থেকে চাদরটাকে সরিয়ে দেয়। সরিয়ে দিয়ে দেখতে চায় উপাদানগুলো কীভাবে সমস্যার ভেতরে কাজ করে। এই বিষয়ে মেরলো-পঁটির বিখ্যাত কাজ উপলব্ধির অস্তিত্ববিজ্ঞান (The Phenomenology of Perception) এবং দৃশ্য ও অদৃশ্য (The Visible and the Invisible)। মেরলো-পঁটি, জ্ঞানের যে চালচিত্রগুলোর মধ্যে, ভাষাকে দেখতে চেয়েছেন, সেগুলো হল: শরীরের ভাষা (দ্য ল্যাঙ্গুয়েজ অফ দ্য বডি), যোগাযোগের দর্শন এবং মনস্তত্ত্ব (দ্য ফিলোসফি অ্যান্ড সাইকোলজি অফ কমিউনিকেশন), পরোক্ষ ভাষা (ইনডিরেক্ট ল্যাঙ্গুয়েজ) এবং প্রত্যক্ষের ভাষা (দ্য ল্যাঙ্গুয়েজ অফ ভিজিবিলিটি)। দেখতে চাওয়ার এই প্রত্যেকটা পরিসরে ভাষার যাথার্থ নির্ণয়ে কাজ করে কিছু দ্বন্দ্বমূলক এবং বিরোধমূলক সম্পর্ক - যারা প্রত্যেকেই বিশেষ বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী।

 

মেরলো-পঁটি ছিলেন তাঁর পূর্ববর্তী আচরণবাদের সমালোচক। কিন্তু ভাষার ধারণার সপক্ষে তাঁর দেওয়া আচরণের গঠনের যে ব্যাখ্যা সেটার মধ্যে সমস্যা ছিল। তিনি আকরণ এবং সামগ্রিক (গেস্টাল্ট) ধারণার ওপর জোর দিয়েছিলেন প্রথম দিকে। যে কারণে ফেনোমেনোলজি অফ পারসেপশন (১৯৪৫) বেরোনোর আগে পর্যন্ত তাঁর কাজে সোস্যুরের প্রভাব তেমনভাবে ছিল না। মেরলো-পঁটি যে শরীর-এর কথা বলেন, সেটা মূলত, ভাষা (স্পিচ অর্থে) এবং অভিব্যক্তির এলাকা। শরীর ভাষা এবং অভিব্যক্তির মধ্যে দিয়েই রূপান্তরিত হয়। সেক্ষেত্রে বস্তু এবং বিষয়ী (অবজেক্ট-সাবজেক্ট) - এই বৈপরীত্যের আর কোনো প্রয়োজন পড়ে না। কারণ, শরীরের মধ্যে ভাষা বলার মধ্যে দিয়ে, মানে নিজেই নিজেকে গড়ে তোলে। একজন কথা-বলা বিষয়ী, বিদেহী চৈতন্যের পথে পা না বাড়িয়ে, তার শরীরী অঙ্গভঙ্গির মধ্যে দিয়েই ভাষা বহন করে নিয়ে চলে। চৈতন্য ইতিমধ্যেই বস্তুগত এবং ভাষা (ওই স্পিচ অর্থে) অর্থপূর্ণ চিন্তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। কথা বলার ক্ষেত্রে, উচ্চারণের ক্ষেত্রে, সংকেত পাঠানোর ক্ষেত্রে, শরীরই হচ্ছে মানে উৎপাদনের পরিসর। সুতরাং, কথা বলা-র ভেতরে অন্তর্ভুক্ত এক-একটা শব্দের শরীরই হচ্ছে - বাচিক অভিব্যক্তির বাস্তবিক সরঞ্জাম। ভাষার উপলব্ধির অস্তিত্ব-নির্ভর ভাষ্যে মেরলো-পঁটি, দুরকমের কথা বলা-র (স্পিচ) কথা বলেন। এক, যা বলা হচ্ছে এমন কথা (স্পিকিং স্পিচ), আর দুই হচ্ছে, বলা হয়ে গেছে এমন কথা (স্পোকেন স্পিচ)। বিশেষ অর্থে তাঁর মতে সব চিন্তাই ভাষা। চিন্তা শরীরে সক্রিয় হয় তখনই যখন সেই চিন্তা কথার মধ্যে দিয়ে ব্যক্ত হয়েছে। সেই কথা কে বলে - বলে একজন কথা-বলা বিষয়ী। ভাষা হচ্ছে যা বলা হয়ে গেছে এবং যা বলা হচ্ছে তার মধ্যেকার জিনিস। সুতরাং, ভাষা আসলে কথা বলা ছাড়া কিছু নয়। কিন্তু যে কথা বলা-কে ইতিমধ্যেই শরীর বলা হয়েছে, সেটা বাক প্রত্যঙ্গের পরীক্ষামূলক ব্যবহার, শব্দের উচ্চারণ, ধারণার অভিব্যক্তি, ইত্যাদি।

 

এই যে মেরলো-পঁটি, চিন্তার অভিব্যক্তি থেকে মানের উৎপাদন - এই ক্ষেত্রে বলা হয়ে গেছে এমন কথা-র (স্পোকেন স্পিচ) ওপর জোর দিচ্ছেন - ওইটাকেই এই রচনায় আমি বলছি শ্রোতার পরিসর। যখন ইংরিজিতে এইসব লেখা অনুবাদ করব তখন লিখব, স্পেস অফ হিয়ারার। ধরুন এই মুহূর্তে কোনো কথোপকথনে, যে বক্তার ভূমিকা গ্রহণ করছে - সেও শ্রোতা। পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতায় শ্রোতার ভূমিকায় ছিল বলেই, কথা-বলা বিষয়ীর চিন্তায়, মানে উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভাষার গঠন ও অভিব্যক্তির নানান ধরন সংশ্লিষ্ট থাকে।

 

একটা যোগাযোগ ব্যবস্থায় বা কমিউনিকেশনে কথা-বলা বিষয়ীর ভূমিকা কী এবং চিন্তা ও ভাষার মধ্যে সম্বন্ধ কোথায় - এই প্রশ্নের উত্তর দেবার চেষ্টা করেছিলেন মেরলো-পঁটি। এই উত্তর দেবার জন্য তিনি - মনস্তত্ত্ব, ইতিহাস, ভাষাবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের - মধ্যে বৈজ্ঞানিক গোঁড়ামির (scientisms) গভীর সমালোচনা করেছিলেন। রীতি এবং গঠনের প্রমাণ এবং ভাষার সময়ের সাপেক্ষে বিবর্তনের ভিত্তিতেই মেরলো-পঁটি গ্রন্থনবাদী ভাষাতত্ত্বের সোস্যুর-কথিত এককালিক ও বহুকালিক সূত্রগুলোকে গ্রহণ করেছেন। এই দু-ধরনের ব্যাপারই কথা-বলা বিষয়ীর মধ্যে একসঙ্গে কাজ করে। মেরলো-পঁটি বলছেন, আমি যখন কথা বলা-য় অংশগ্রহণ করি, তখন, যে শব্দগুলো আমি উচ্চারণ করি সেগুলোকে ঘিরে থাকে মানের আবহ। ভাষার দর্শনকে তাই ভাষার প্রত্যক্ষ অস্তিত্ব-এর বাইরে গিয়ে ভাবতে হবে যাতে ভাষার সঠিক উপলব্ধি ঘটে। সেই কারণে মেরলো-পঁটি ভাষার ধ্বনিগত চরিত্রের ওপর জোর দেন নি। কারণ সেই চরিত্র বস্তুগত, তার নিজস্ব চেহারা আছে - কিন্তু সেই চেহারা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে যায়। মেরলো-পঁটি বলছেন, আমরা আমাদের সাধারণ জীবনযাত্রার মধ্যে দিয়ে যে প্রত্যয় অর্জন করি, সেটা ভাষার তন্ত্রের মধ্যে, আমাদের অবচেতনে আগে থাকতেই জমা আছে। কারণ কথা বলা বিষয়ী সেই প্রত্যয় সম্পর্কে সচেতনভাবে জেনে ওঠার আগেই সেই প্রত্যয়ের পক্ষপাতিত্ব করে এবং তাকে জ্ঞানে উন্নীত করে। অথচ সেই প্রত্যয়কে প্রথমে বিষয়ী বা যোগাযোগের বাসনা (desire for communication) মধ্যে তার যে বেঁচে থাকা, তার শর্ত হিসেবে গ্রহণ করা হয়, সেটা তখনও প্রকটভাবে থাকে না। ভাষাতত্ত্বে এই যোগাযোগের বাসনা মনস্তাত্ত্বিক আকারের সমতুল। অথচ প্রত্যয়, ধারণার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার বস্তুনিষ্ঠ অস্তিত্বের থেকে বিচ্ছিন্ন। তাই আমার কিন্তু খিদে পেয়েছে বলার সময় বক্তার মনে আগে থাকতেই তৈরি হওয়া যোগাযোগের বাসনা-র মধ্যেই নিহিত ছিল ওই বিশেষ প্রত্যয় আর তার মানেগত আবহ।

 

আমরা অনত্র্য দেখিয়েছি, সোস্যুরের ভাষ্যে সংকেতিতর দিকে যেমন বস্তু ও ধারণার পরস্পরের মধ্যে ফারাক রয়েছে - তেমনই সংকেতকের দিকেই ধ্বনিচ্ছবি বা সাউন্ড ইমেজের নিজেদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এবং সংকেত এই যে জোড়া সংকেতক-সংকেতিত সম্পর্কের ভিত্তিতে তৈরি হল, সেই সম্পর্ক অবাধ বা আর্বিট্রারি। কিন্তু সম্বন্ধের ওই অবাধত্বটাই সেখানে প্রচলিত বা সেটাই দস্তুর। কারণ সংকেতের অবাধ প্রকৃতির ফলেই ভাষার এক ভেদমূলক তন্ত্র তৈরি হয়। সেখানে প্রতিটি বিশিষ্ট ভাষাতাত্ত্বিক ঘটনাই হচ্ছে যোগাোগের সক্রিয়তার মধ্যে স্বতন্ত্র অস্তিত্ব। (১খ) এইরকমই এক বিশিষ্ট ভাষাতাত্ত্বিক ঘটনা। যেহেতু, অসংখ্য বস্তু বা ধারণার সাপেক্ষে মূল্যের বিনিময় করা যায়, সেহেতু, কোনো নির্দিষ্ট যোগাযোগে তাৎপর্য নির্মাণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ওই তাৎপর্যের নিরিখেই যোগাযোগের অভিজ্ঞতা ভাষার ভেদমূলক তন্ত্রকেই প্রতিষ্ঠিত করে। সংকেত উচ্চারণের মধ্যে দিয়েই একজন কথা-বলা বিষয়ী নিজে যে আসলে একটা বৃহৎ কৌমের অংশ, সে কথা বুঝতে পারে।

 

পরোক্ষ ভাষাকে মেরলো-পঁটি বলেন নৈশব্দের কণ্ঠস্বর। তাঁর ভাষায়: ভাষা দীর্ঘ সময় ধরে সম্ভাবনাময় এক পরিসর। সেখানে সম্ভাবনা সংবর্তনের মধ্যে দিয়ে বাস্তব হয়ে উঠবে। সবাক বিষয়ী সেই সম্ভাবনার মধ্যে থেকে সেইসব অভিব্যক্তি বেছে নেবে যেগুলোর নিজস্ব কোনো মানে নেই। কেননা, যেগুলো ব্যবহারযোগ্যতা হারায়, সেগুলো ভাষায় একটা পরিত্যক্ত জীবনে চলমান থাকে এবং যে পরিসরগুলো পূরণ করা দরকার সেগুলো আগে থাকতেই চিহ্নিত থাকে শূন্যস্থান বা প্রয়োজন বা প্রবণতা হিসেবে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল, মেরলো-পঁটি বলছেন, শব্দগুলোর মধ্যে যে বিরাম থাকে সেই বিরামগুলোর মধ্যে যে পারস্পরিক অংশীদারিত্ব (intersection) থাকে - তার ভেতরেই নিহিত থাকে মানে। তাই মানে যখন উৎপন্ন হয় তখন সে যে শূন্যস্থান পূরণ করে সেগুলো আগে থাকতেই অভিব্যক্তির জন্য চিহ্নিত ও প্রস্তুত থাকে। ভাষা নিজে কথা বলে না। ভাষার এই নৈশব্দই - কথা বলা, লেখা, ছবি আঁকা - এই সমস্ত অভিব্যক্তির পথ প্রশস্ত করে। অর্থাৎ ভাষা নিজে মানে বোঝায় না, ভাষা কেবল এক খোলা দ্বান্দ্বিক জায়গায় এনে বিষয়ীকে দাঁড় করায়, যেখানে তাৎপর্য তৈরি হয় সেই দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়ে, বিভেদের ভেতর দিয়ে। মেরলো-পঁটির মতে আক্ষরিক অর্থে পরোক্ষ ভাষা তাৎপর্য তৈরির মধ্যিখানের ব্যবধানে মানে তৈরি করে। প্রত্যক্ষের ভাষা বোঝা যায় দৃশ্য এবং অদৃশ্য পাঠ্য বা টেক্সটকে পরীক্ষা করতে গেলে। প্রত্যক্ষের ভাষা হচ্ছে এমন এক ভাষ্য তৈরির সুযোগ যেখানে বৈষম্যের, দ্বন্দ্বের বা স্বাতন্ত্রের সত্তাতত্ত্বকে স্বাধীনভাবে কাজ করবার সুযোগ দেওয়া হয়। মজার কথা হচ্ছে প্রত্যক্ষের ভাষা নিজেও অভূতপূর্ব এক অভিব্যক্তি হয়ে ওঠবার চেষ্টা করে।

 

[৫]

এবার আসি পরিস্থিতির কথায়। ঐতিহাসিকভাবে তাকে আপনারা প্রেক্ষিতও বলতে পারেন। এই পরিস্থিতি বা কনটেক্সট বক্তব্যতত্ত্বের এলাকায় আর-এক গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। আপনি এমনিতে একটা শব্দের যা আভিধানিক মানে পান, পরিস্থিতির সাপেক্ষেই তো সেই শব্দের সর্বাধিক মানের সম্ভাবনা গড়ে ওঠে। কারণ একটা ভাষিক পরিস্থিতির সঙ্গে ওতোপ্রোত সম্বন্ধে জড়িয়ে থাকে মানুষে মানুষে সম্পর্কের নানা দিক, যে সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে তাঁরা পরস্পরের সঙ্গে ভাবের আদান প্রদান চালিয়ে যান। এই দেখুন না, যে কিন্তু নিয়ে এত কথা বলতে বসেছি সেই কিন্তুর আভিধানিক মানে পেরিয়ে যখন সেটা কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে ব্যবহৃত হচ্ছে তখন কত রকমের বক্তব্যের অভিপ্রায় সে বহন করে নিয়ে চলেছে। কারণ রোজকার আটপৌরে কথোপকথনের প্রতিটি পরিস্থিতি ডিসকোর্স বা সন্দর্ভের সঙ্গে জড়িত থাকে। (১খ)-এর বাক্য ব্যবহারের সঙ্গে ওই-রকমই পরিস্থিতি কল্পনা করা হয়েছে মাত্র। ওই একই বা সমগোত্রীয় উচ্চারণের আরও নানান প্রেক্ষিত থাকতে পারে। যেমন, একই রকমভাবে (৩)-এর বাক্য লক্ষ্য করা যাক।

 

(৩) তখন কিন্তু আমাকে দোষারোপ করতে পারবে না

 

(৩)-এর উচ্চারণের একটা বাস্তবিক ও সামাজিক দিক আছে। তার সঙ্গে আছে অনুমানের একটা দিক যা বক্তা এবং শ্রোতা পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে আদান প্রদান করে। যাকে আমরা পরিস্থিতি বা কনটেক্সট বলছি সেটারও রকম-ফের আছে। যেমন, একটা নির্দিষ্ট পারিপার্শিক পরিস্থিতি সেই প্রেক্ষিতের এক রকম। দ্বিতীয়ত; বক্তা এবং শ্রোতা পরস্পর কোনো-না-কোনোভাবে পরস্পর সম্বন্ধযুক্ত। তাদের সম্পর্কের একটা ইতিহাস আছে। তৃতীয়ত; বক্তা ও শ্রোতার কোনো-না-কোনো সামান্য বা নির্বিশেষ অভিপ্রায় আছে যার ফলশ্রুতি হিসেবে তাঁরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছেন। আরও একটা কথা আছে - (১খ) বা (৩)-এর উচ্চারণের মানে বোঝার ক্ষেত্রে। সেটা হল, আমরা যতই বলি-না কেন (১খ) এবং (৩) আসলে এক বা একাধিক বাঙালির মুখের আটপৌরে কথা থেকে তুলে আনা হয়েছে। সত্যিই হয়েছে। তার কোনো প্রামাণ্য দলিল তৈরি হয় নি ঠিকই, কিন্তু আমি আমার পারিপার্শ্বিক জগত থেকেই এই দুটো উচ্চারণকে তুলে এনে আপনাদের কাছে দৃষ্টান্ত হিসেবে ব্যবহার করছি। কীভাবে ব্যবহার করছি? লিখে দেখাচ্ছি। কিন্তু এই লিখে দেখানোর মধ্যে কি আমি ওই ওই নির্দিষ্ট প্রেক্ষিতে, বক্তা-শ্রোতার সামাজিক সম্পর্কের বা তাঁদের ওই নির্দিষ্ট বিষয় সম্বন্ধে পূর্ববর্তী জ্ঞান, প্রত্যয় বা অতীতের কোনো সূত্রের নিরিখে যে সুর কার্যকরী ক্ষেত্রে প্রযুক্ত হয়েছিল - সেটা কি দেখাতে পারছি? পারছি না বলাই বাহুল্য। আপনাদের কাছে (১খ)-এর উচ্চারণের এক কাল্পনিক পরিস্থিতি তৈরি করে দেখাচ্ছি মাত্র। আপনারাও বাঙালি হিসেবে অনুমান করে নিচ্ছেন যে ঠিক ওই পরিস্থিতিতে দিলীপ নামের ওই ভদ্রলোক কেমনভাবে কথাটা ব্যক্ত করতে পারেন। কিন্তু (১খ)-থেকে ওই কিন্তু-টা বাদ দিয়ে সোজা বিবৃতি হিসেবে যদি বলতাম, দিলীপ নামের ওই ভদ্রলোক বলছেন: আমার খিদের পেয়েছে তাহলে বাংলা ভাষার ব্যাকরণের ইতিহাস এতদিন আপনাকে তার যে নিয়ম-কানুন শিখিয়েছে তার রূপকার হিসেবে আপনি বাঙালি হয়ে ততটা দ্বিধান্বিত থাকতেন না যতটা রয়েছেন ওই বিশেষ কিন্তু ব্যবহারের পর।

 

এইখানেই আরেকটা কথা বলা প্রয়োজন। (১খ বা ৩)-কে উচ্চারণ হিসেবে পেশ করলেও সেগুলো আসলে লিখিত হয়েছে। যতই মানুষের মুখের ভাষাকে বেশি বাস্তব বলে ধরে নিই না কেন সেও আসলে এক ধরনের লিখন এবং পরিস্থিতির সাপেক্ষে সেটা ব্যবহৃত হওয়ার সেটা একটা পাঠ্য বা টেক্সট হিসেবেও অস্তিত্ত্বশীল বিশেষত যার সঙ্গে কনটেক্সটের গভীর সম্পর্ক। সুতরাং আপনি নিজে যেহেতু, ওই নির্দিষ্ট প্রেক্ষিতে যখন বক্তা-শ্রোতার মধ্যে ওই কথা হচ্ছে, সেখানে উপস্থিত ছিলেন না অথচ আমার অনুরোধের জেরে আপনাকে ওই উচ্চারণকে বুঝতে হচ্ছে তখন আপনার কাছে ওই পাঠ্য বা টেক্সটকে পড়ে তার ভাষ্য নির্মাণ ছাড়া আর গতি নেই। দেরিদা পাঠ্যের এই পাঠের তরিকা হিসেবে অবিনির্মান-এর কথা তোলেন। এক্ষেত্রে তিনি বলবেন প্রথমত ওই কিন্তু-ওয়ালা উচ্চারণের সঙ্গে কিন্তু-ব্যতীত বা অন্যান্য কাছাকাছি উচ্চারণের যেমন ধরুন, দিলীপ (১খ)-এর বাক্য না বলে বললেন, আমার না খিদে পেয়েছে বা আমার তো খিদে পেয়েছে বা তার কাছাকাছি কোনো কিছু ওই একই অভিপ্রায়কে ব্যক্ত করার জন্য তাহলে প্রতিটা উচ্চারণের সঙ্গে প্রতিটা উচ্চারণের যে পার্থক্য সেই পার্থক্যের পটভূমিও তো শ্রোতার জানা। সুতরাং সেই পার্থক্যের জেরে ওই (১খ)-এর উচ্চারণই যে ওই পরিস্থিতিতে অনিবার্য হয়ে উঠেছে তেমন নয়। দ্বিতীয়ত, এইসব টানাপোরেনের ফলশ্রুতি হিসেবে আপনিও তো ওই পাঠ্যাংশের মানেটাকে স্থগিত রাখছেন। সুতরাং ওই উচ্চারণের ভাষ্য রচনা করতে আপনারও ওই শ্রোতার মত সমস্যা হচ্ছে। ভবিষ্যতের বক্তব্যতত্ত্বের কাজ হওয়া উচিত ওই সমস্যাগুলোর সামনে দাঁড়ানো।

 

এই বিষয়ে প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রে বা ব্যাকরণে বিস্তর কথা হয়েছে - সে খবর রাখি। আমি নিজে সংস্কৃত জানি না ফলে দ্বিতীয় কোনো সূত্র থেকে আমাকে সেই খবর সংগ্রহ করতে হয়। এক্ষেত্রে আমি দুটো ইংরিজি ভাষায় লেখা গ্রন্থের কথা উল্লেখ করতে চাই। দুটিই বিমলকৃষ্ণ মতিলালের লেখা: দ্য ওয়ার্ড অ্যান্ড দ্য ওয়ার্লড এবং লজিক ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড রিয়্যেলিটি। আমার তার বেশি আর সাধ্য নাই। ওই গ্রন্থ পাঠ করে, কথোপকথন ও উচ্চারণ (আটারেন্স) বিষয়ে সংক্ষিপ্ত কিছু বলা এই মুহূর্তে ভীষণ দরকার। ওই বইদুটোর নাম করে রাখলাম কারণ, আমি মূল টেক্সট পড়ে কথা বলছি - এই ভুল যেন পাঠকের না হয়, দ্বিতীয়ত, ওই সমস্ত সংস্কৃত পাঠ্যের অন্যান্য ভাষ্যও তো বাজারে রয়েছে - সেখানে কোনো ধারণার অন্য কোনো ভাষ্যের বক্তব্যকেও ছুঁয়ে দেখা আমার হয় নি। যদি কেউ কোনো টেকনিকাল প্রশ্ন তোলেন, আমার এই রচনা থেকে তাহলে সেক্ষেত্রে আমার কাছ থেকে তার সদুত্তর পাবার সম্ভাবনা কম। আমার কাছে এই বইদুটো ধ্রুবসত্যের মতো। আর ভারতীয় দর্শন কোষ-এর কতকগুলো খণ্ড আছে - যেগুলো একদা সংস্কৃত কলেজ থেকে প্রকাশিত হয়েছিল, শ্রী মোহন ভট্টাচার্য এবং দীনেশচন্দ্র ভট্টাচার্য শাস্ত্রীর সম্পাদনায়। ওই কোষগ্রন্থে বেশ কিছু প্রাচীন ভারতীয় ধারণার সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। যাই হোক এই বইগুলোই আপাতত আমার ভরসা। দরকারটা এই যে - কথোপকথনে বা মানুষের আটপৌরে ব্যবহারে শব্দ উচ্চারণের মানে, বক্তার অভিব্যক্তি এবং শ্রোতার সেই অভিব্যক্তি বুঝে নেওয়া বা উপলব্ধি করার ক্ষমতা - এসব নিয়ে ভারতীয় শাস্ত্রকারদের বক্তব্য কী, সেসব বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করা!

 

ভারতীয় দর্শনে মনে করা হয়, উচ্চারণ হচ্ছে জ্ঞানের একরকম উৎস। এই কথা আলোচনা করতে গিয়ে মতিলাল ন্যায় দর্শনের বক্তব্যকেই অনুসরণ করেছেন। তবে প্রথমেই তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন - যে জ্ঞানের উৎপত্তি উচ্চারণ থেকে তা কিন্তু উপলব্ধি বা পারসেপশন এবং অনুমান বা ইনফারেন্সের থেকে আলাদা বস্তু। শব্দ বলতে ভারতীয় শাস্ত্রে মানুষের ভাষাকে বোঝায়, মানুষের ভাষা অর্থ ভাষা উচ্চারণ। আমি অন্যত্র সোস্যুর পাঠ করতে গিয়ে দেখিয়েছি যে, সোস্যুর ল্যাঙ্গুয়েজ আর হিউম্যান স্পিচকে আলাদা করেছেন। আমি ওইদুটোকে এখানে শুধু ভাষা আর মানব-ভাষা বলে ডাকছি। এবং মানুষের ভাষা বলতে আমি সোস্যুর-কথিত ওই মানব-ভাষা-র ধারণাই ব্যবহার করছি - যেখানে মানুষ আসলে একটা বিশেষ কৌমের অংশ। এখানে মানুষের ভাষা কোনো বিশেষ সংস্কৃতির বা কৌমের অংশ হিসেব ব্যক্তিমানুষকর্তৃক বিশিষ্ট্য ভাষা - এবং উচ্চারণ বলতে সেই ভাষার বিশিষ্ট্য উচ্চারণ বোঝাচ্ছি। মানুষের উচ্চারিত ভাষা উৎপন্ন হবার প্রক্রিয়াটা মতিলাল যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন - সেটা বলার চেষ্টা করছি:

 

ক) বক্তার মুখ থেকে নিসৃত হল ধ্বনি। ওই ধ্বনি ভাষায় উচ্চারণের খণ্ডাংশ।

খ) অর্থাৎ বক্তার মুখ থেকে সামগ্রিকভাবে ওই উচ্চারণ নিসৃত হল। উচ্চারণের উদ্দেশ্য বক্তার তরফ থেকে জ্ঞান অথবা তথ্য শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়া।

গ) শ্রোতাও সেই ভাষা-কৌম বা সংস্কৃতির সদস্য, যে ভাষা-কৌম বা সংস্কৃতি বক্তারও। অর্থাৎ ভাষা-নিজস্ব জ্ঞান শ্রোতার আছে।

ঘ) উচ্চারণে বাক্য থাকতে পারে এবং সেই বাক্য শব্দসমষ্টির মধ্যে দিয়ে গড়া। কখনো উচ্চারণ একটা মাত্র শব্দেরও হতে পারে।

ঙ) শ্রোতার ওই উচ্চারণে ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দের উপলব্ধি আছে।

চ) যেহেতু শ্রোতা ওই ভাষা কৌমের সদস্য এবং উচ্চারণে ব্যবহৃত প্রতিটা শব্দের উপলব্ধি তাঁর আছে সেহেতু শ্রোতাকে মনে করিয়ে দেওয়া গেল যে ওই প্রতিটা শব্দের সঙ্গে কোনো না কোনো বস্তু, ধারণা, বা মানে সংশ্লিষ্ট।

ছ) শ্রোতা এরপর উচ্চারণের মধ্যে দিয়ে ব্যক্ত ওইসমস্ত সংশ্লিষ্ট মানের জ্ঞান লাভ করলেন।

জ) এছাড়াও অনেক সহায়ক ঘটনা বা সমগ্র জ্ঞানের খণ্ড খণ্ড জ্ঞান রয়েছে - যার সাহায্যে পরিশেষ বা অন্তিম বা চরম জ্ঞানে পৌঁছোয় উচ্চারণ।

 

যেমন, উচ্চারিত বাক্যের মধ্যে দিয়ে জ্ঞানে পৌঁছোতে গেলে বাক্যে ব্যবহৃত প্রতিটা শব্দকে পরস্পরের সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত হতে হবে। এবং ধরে নেওয়া হবে যে সেই সম্বন্ধ ব্যাকরণসম্মত। দ্বিতীয়ত; শাব্দিক উপাদানগুলোর মানে সঠিকভাবে প্রযুক্ত হতে হবে। অর্থাৎ প্রত্যেক শব্দের মানে অপরের উপযুক্ত হতে হবে। অর্থাৎ বক্তা যদি বলেন, ঘোঁড়ার ডিমের তরকারি খেলাম, তাহলে চলবে না। কারণ শ্রোতার ঘোঁড়া, ডিম, তরকারি, খাওয়া, প্রভৃতি সমস্ত শব্দের পৃথক উপলব্ধি আছে। তাই তিনি জানেন আসলে ঘোঁড়া ডিম পাড়ে না (যদিও এই দৃষ্টান্তে অন্য অনেক কথা চলে আসে। তবে সেসব কথা এখন থাক।) তৃতীয়ত; শাব্দিক উপাদানগুলোর স্থান ও কালগত যাথার্থ থাকতে হবে। চতুর্থত; যদি কোনো বাক্য দ্বর্থ্যক হয় - তাহলে শ্রোতা তার পূর্ববর্তী জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে বুঝে নেবে ওই বিশেষ পরিস্থিতিতে বক্তা কেন ওই দ্বর্থ্যক বাক্য উচ্চারণ করলেন। ইত্যাদি। এই সমস্ত ব্যাপারগুলোকে মতিলাল বলেছেন কজাল মেকানিজম বা কার্য-কারণ সম্বন্ধের প্রক্রিয়া।

 

উচ্চারণের ক্ষেত্রে শব্দ পরিভাষাটার ওপর এত জোর দেওয়ার কারণ ভারতীয় শাস্ত্রে শব্দ পরিভাষাটা অনেক ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত। ভারতীয় দর্শন কোষে শব্দ ও শব্দবোধ নিয়ে কী বলা হয়েছে তার বর্ণনা দেওয়া যাক। শব্দ বলতে - প্রথমত বলা হয়েছে; শব্দ মানে হচ্ছে শব্দ প্রমাণ এবং আপ্তেয় বাক্য। পদার্থের ধর্ম (এখানে পদার্থ বলতে কিন্তু বস্তু নয়। ক্যাটেগোরি বা অবস্তুবাচক বস্তুকে পদার্থ বোঝায় - ন্যায়শাস্ত্রে) জেনে যে ব্যক্তি সেই ধর্ম সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় সম্বন্ধে কাউকে কিছু বলতে ইচ্ছে করেন তবে তিনিই যথার্থ বক্তা। যেমন, যথার্থ বক্তা মাত্রই পূর্বোক্ত আটটা যুক্তি সম্বন্ধে অবহিত থাকবেন। সেই যথার্থ বক্তার উপদেশ হল বাক্য। দ্বিতীয়ত বলা হয়েছে; শব্দ হচ্ছে শ্রবণেন্দ্রিয়গ্রাহ্য গুণবিশেষ। এইখানে শ্রোতার প্রসঙ্গকে সরাসরি টেনে আনা হয়েছে শব্দবোধ-এর পরিসরে। এই ব্যাখ্যায় আরও অনেক প্রসঙ্গ আছে। যেমন; এই ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে - শব্দ মাত্রই অনিত্য। শ্রবণেন্দ্রিয় অর্থাৎ কানের সঙ্গে শব্দের সাক্ষাৎ সম্বন্ধ হয়। অর্থাৎ কান যেন শব্দকে দেখতে পায় (বুঝতে পারা অর্থে)। এই যুক্তির সাহায্যে প্রাচীন ভারতের অন্যতম বিশিষ্ট দার্শনিক সম্প্রদায় মীমাংশকরা শব্দকে দ্রব্য বলে থাকেন। কিন্তু নৈয়ায়িকরা বলেন, শব্দ একরকমের বিশেষ গুণ। নানান অনুমানের মধ্যে দিয়ে শব্দে গুণত্ব সাধিত হয়। সেখানে ধ্বনি ও বর্ণ উভয়কেই শব্দ বলা হয়েছে। বলা হচ্ছে - মৃদঙ্গ, ঘণ্টা - এই সমস্ত সরঞ্জাম থেকে যে আওয়াজ উৎপন্ন হয় সেটা ধ্বনি, আর মানুষের ঠোঁট, গলা, তালু - ইত্যাদির মাধ্যমে যে আওয়াজ বেরোয় সেটা বর্ণ। আমি আগেও বলেছি, এখনও বলছি - ভারতীয় শাস্ত্রের পরিভাষাগুলোকে আধুনিক অর্থে ব্যবহার করলে চলবে না। বরং প্রাচীন ভাষ্যগুলোকে ব্যবহার করতে হবে নতুন নতুন ভাষ্যের সঙ্গে মিলিয়ে।

 

শব্দের উৎপত্তি কীভাবে হয়? কেউ কেউ বলেন - জলের কোনো স্থানে তরঙ্গ সৃষ্টি হলে - সেই তরঙ্গ থেকে তার চারপাশে আরেকটি তরঙ্গ রেখা জন্মায়। এই ভাবে এক তরঙ্গ থেকে আরেক তরঙ্গ তার থেকে আরও শত তরঙ্গের উৎপত্তি ঘটে। ঠিক সেই রকম বাদ্যবাকযন্ত্রাদি থেকে শব্দ উৎপন্ন হলে তা তরঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে। শব্দের ওই তরঙ্গ শ্রোত্রাকাশে অর্থাৎ শ্রবণেন্দ্রিয় মারফৎ শ্রোতার উপলব্ধি হলে তখনই সেই শব্দকে প্রত্যক্ষ করা যায়।

 

দর্শনকোষ আরও জানিয়েছে, শাব্দবোধ বলতে শব্দ থেকে মানুষের যে জ্ঞান লাভ হয় তাকে বোঝায়। অর্থাৎ বাক্যার্থবোধও একই জিনিস। অর্থাৎ বলে দেওয়া হচ্ছে, এখানে শব্দ বলতে পদ ইত্যাদির সমন্বয়ে বাক্যকেই বুঝতে হবে। প্রত্যেক পদের মধ্যে তার নিজস্ব পদার্থ অর্থাৎ স্মৃত্যাত্মক জ্ঞান-এর উপস্থিতি আছে। আমরা গ্রাইসেও এই একই যুক্তি পাই ইমপ্লিকেচারের ব্যাখ্যায়। এমনকি মেরলো-পঁটির ব্যাখ্যাতেও উচ্চারণের এই মর্মই উদ্ধৃত হয়েছে। প্রত্যেক পদ আলাদা করে উচ্চারণ করলে প্রত্যেক শ্রোতা তাঁদের স্মৃতি থেকে সেইসব পদের জ্ঞানকে জাগ্রত করেন। শাব্দবোধের ব্যাখ্যাকার বলেছেন, বাক্যে উপস্থিত সমস্ত পদ ইত্যাদির সকল পদার্থ বিশেষ্য বিশেষণ ভাবাপন্ন হয়ে একটা বিশেষ অর্থ প্রকাশ করে এবং শ্রোতার মনে সেই বিশিষ্ট অর্থের বোধ হয়। সেই বোধই শাব্দবোধ। এই শাব্দবোধের আরেক নাম, অন্বয়বোধ। শাব্দবোধের কয়েকটা নিয়ম আছে। প্রথমত; একের বেশি পদ সমন্বিত হয়ে তা বাক্যতাপ্রাপ্ত হলেও তা থেকে শাব্দবোধ হওয়া সম্ভব। অর্থাৎ, শাব্দবোধের ক্ষেত্রে পদগুলোর আলাদা মানে থেকে নয় সামগ্রিক অস্তিত্ব হিসেবে বাক্য থেকেই শ্রোতার বোধ জন্মাতে হবে। দ্বিতীয়ত; বাক্যতাপ্রাপ্ত হলেও বাক্যের প্রতিটা পদে যেহেতু নানা পদার্থ উপস্থিত, সেহেতু সেই প্রত্যেক পদের বিশিষ্ট বোধও শ্রোতার থাকতে হবে। এরপর ওই প্রত্যেক পদের নিজের নিজের বৃত্তিজ্ঞানের মধ্যে সম্বন্ধ রচিত হলে - তা থেকে সামগ্রিক বোধ জন্মাবে। তৃতীয়ত; কর্তৃবাচ্যে কর্তা, কর্মবাচ্যে কর্ম এবং ভাববাচ্যে ভাব অর্থাৎ ক্রিয়া সর্বত্রই মুখ্যবিশেষ্যরূপে প্রতীয়মান হয়। এই কথার একটা অন্য খেই আছে। সেকথা মনে করিয়ে দেব আলোচনার একেবারে শেষ পর্যায়ে। চতুর্থত; এক পদার্থের সঙ্গে অন্যান্য পদার্থের তাদাত্ম্য সম্বন্ধ ঘটলে তা থেকে উৎপন্ন মানেকে অভেদান্বয় বলা হয় আর ওই সম্বন্ধ না ঘটলে তাকে ভেদান্বয় বলা হয়। নামের সঙ্গে নামের, নামের সঙ্গে ক্রিয়ার ভেদান্বয় ঘটে না।

 

মতিলাল তাঁর লজিক ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড রিয়্যেলিটি গ্রন্থের একেবারে শেষ অধ্যায়ে শাব্দবোধ নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি পরিষ্কার বলেছেন, শাব্দবোধ হচ্ছে জ্ঞানের একটা খণ্ড যা বাক্যের উচ্চারণের মধ্যে দিয়ে শ্রোতার মধ্যে জন্মায়। এই শাব্দবোধকে তিনি বলেছেন, বাচিক জ্ঞান বা ভার্বাল নলেজ। এই বাচিক জ্ঞান প্রচ্ছন্ন জ্ঞান (ঠিক কোনো অনুমিত জ্ঞান বা ইনফারেন্সিয়াল নলেজের মতো)। যদিও ওই জ্ঞানের জ্ঞানত্ব দুর্বল নয়। মতিলাল বলেছেন, সাধারণভাবে মনে হতে পারে উপলব্ধি বা অনুমানের থেকে বাচিক জ্ঞান, জ্ঞান হিসেবে কম ভরসাযোগ্য। কারণ বাচিক জ্ঞান অপ্রত্যক্ষ (এখানে প্রশ্ন উঠতেই পারে - আমার উপস্থাপন-মারফৎ প্রসারিত বিভ্রান্তির জন্য - একটু আগেই যে দর্শনকোষ থেকে দেখিয়েছি সাক্ষাৎ সম্বন্ধএর কথা যার ফলেই কেবলমাত্র তার ফলেই শাব্দবোধ জন্মায় আর এখন বলছি এই বাচিক জ্ঞান যা শাব্দবোধ থেকে উৎপন্ন হয় - তা অপ্রত্যক্ষ। সেইজন্য বলে নেওয়া দরকার, এখানে অপ্রত্যক্ষ মানে ইন-ডিরেক্ট আর ওখানে সাক্ষাৎ সম্বন্ধ বলতে পদের অস্যোসিয়েটিভ রিলেশন বোঝানো হয়েছে।)। কেননা, যে উচ্চারণের শাব্দবোধের কথা বলা হচ্ছে সেই উচ্চারণের বক্তা, তাঁর সততা, দক্ষতা, ইত্যাদির ওপর নির্ভরশীল এক জ্ঞান। কিন্তু ভারতীয় দর্শন বলে উপলব্ধ জ্ঞান এবং অনুমিত জ্ঞান কোনোটাই বাচিক জ্ঞানের চেয়ে উচ্চমানের নয়।

 

শ্রোতার জ্ঞান যাকে মতিলাল ঈক্ষাগত পর্ব বা কগনিটিভ এপিসোড বলেছেন তার উৎস একটা বাক্যের উচ্চারণের মধ্যে এবং সেই জ্ঞান শ্রোতা লাভ করেন উচ্চারিত বাক্যের অর্থবোধের মধ্যে দিয়ে। ভারতীয় দার্শনিকরাও মেরলো-পঁটির মতোই বক্তার অভিপ্রেত মানে-র চাইতেও শ্রোতার উপলব্ধি বা পারসেপশনের মধ্যে দিয়ে জাত মানে-র ওপর বেশি জোর দিয়েছেন। বক্তার মস্তিষ্কে তো অর্থবোধ হয় না। কিন্তু মজার কথা হল - সেটা শ্রোতার মস্তিষ্কেও ঘটে না। এমন তো হতেও পারে যে শ্রোতা, বক্তার কথা শনলেন কিন্তু সেই কতার মানেই বুঝতে পারলেন না। মতিলাল বলছেন, আসলে আমরা বক্তা বা শ্রোতা - কার মস্তিষ্কের গভীরে কী ঘটছে - সেটা বুঝতে পারি না। কিন্তু ভারতীয় দর্শনে শ্রোতাকে ধরেই নেওয়া হয়েছে একজন আদর্শ শ্রোতা হিসেবে - যাঁর ভাষাজ্ঞান ও ভাষা-দক্ষতা আছে। অর্থাৎ শাব্দবোধ বলতে যে জ্ঞানের কথা বলা হয়েছে তা আদর্শ শ্রোতা এবং বাক্যের মানের যৌথ ফলাফল। প্রত্যেক শ্রোতার জ্ঞানপর্ব বা নলেজ এপিসোডগুলো প্রত্যেকে প্রত্যেরের থেকে আলাদা হতে পারে কিন্তু তাদের গঠনগত উপাদান এক। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, মতিলাল বলেছেন, শব্দার্থের যে জ্ঞান শ্রোতার হয় উচ্চারিত শব্দের থেকে - তার পেছনে সংশ্লেষ ও স্মৃতির কতকগুলো মনস্তাত্ত্বিক কার্যক্রম রয়েছে।

 

ভারতীয় শাস্ত্রমতে বাক্য বলতে কেবলমাত্র শব্দের সমষ্টিকেই বোঝায় না - এমন শব্দসমষ্টিকে বোঝায় যার নির্দিষ্ট প্রকরণ ও নিয়ম আছে আর যা চিন্তার সামগ্রিক প্রকাশের একক হিসেবে কাজ করতে পারে। ন্যায় দর্শন ভাষার একটা আনবিক চেহারার কথা ধরে নেয়। তাঁরা বিশ্বাস করেন পদের মানেগুলো সংগঠিত হয়েই পূর্ণ বাক্য ওরফে আদর্শ শ্রোতার জ্ঞানের সংগঠক উপাদান হয়ে ওঠে। শ্রোতার জ্ঞানের ক্ষেত্রে আরেকটা সমস্যা আছে। যদি ধরে নেওয়া হয় ওই আনবিক উপাদানগুলোকে এমনভাবে উপস্থাপিত করা হল - যা ভাষার ব্যাকরণসম্মত নিয়মকে মান্যতা দিল না। যদিও ওই ভাষাতেই তা উপস্থাপিত হল। এ এক অসম্ভব ব্যাপার। তবু যদি তর্কের খাতিরে ওইরকম শব্দসমষ্টি ধরে নেওয়া হয়, তাহলে ন্যায় দার্শনিক যুক্তি দেবেন - এক্ষেত্রে শ্রোতার জ্ঞান হবে না - যেহেতু ওই বাক্যে শাব্দবোধের অন্যান্য পূর্বশর্তগুলো মেনে নেওয়া হয় নি।

 

[৬]

গ্রাইস-কথিত ইমপ্লিকেচারের গুরুত্ব এইখানেই। গ্রাইস বলেন যে - বক্তা যা উচ্চারণ করল - আপনি ব্যাকরণের সাধারণ নিয়ম মেনে অভিধানের অভিধাগুলোকে সমন্বিত করে সেই উচ্চারণে মানে বোঝার চেষ্টা করলে বিপদে পড়বেন। ইমপ্লিকেচার হল তাইই যা প্রতিটা প্রেক্ষিতে প্রতিটা উচ্চারণকে তার আক্ষরিক মানের চেয়েও আরও বেশি কিছু বা অন্য কিছু বুঝতে আপনাকে সাহায্য করে। আমি আগেই বলেছি - আপনার এই বুঝে নেওয়ার ক্ষেত্র আপনার নিজের ভাষার কোনো উচ্চারণের ক্ষেত্রে আপনাকে আলাদা করে আনুষ্ঠানিকভাবে শিখে নিতে হয় না। চমস্কির বিশ্বজনীন ব্যাকরণের ধারণাকে যদি মেনে নিই তাহলে আপনি ভাষা ব্যবহার করবার সম্ভাব্য ছক নিয়েই জন্মেছেন। আর একটা সমাজে এক বা একাধিক সংস্কৃতির আবহে বড় হয়ে উঠতে উঠতে ভাষার নানান ব্যবহারের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই কথা জরুরি হয়ে ওঠে যখন আপনিও জানতে চান যে আপনার এই কথার বিশ্বের ভবিষ্যত কী বা কীভাবে আপনি সহানুভূতির পাশাপাশি সমানুভূতির গুরুত্বকে মর্যাদা দিতে শিখবেন।

 

গ্রাইস বলছেন, ইমপ্লিকেচার হল, মানুষ যা বলে তা আসলে ওই ভাষার ওই নির্দিষ্ট উচ্চারণের আক্ষরিক অর্থের থেকে আলাদা কোনোরকম অভিপ্রায়ের আভাস দেয়, পরামর্শ দেয়, অনুরোধ করে, ইত্যাদি। ফলে, নির্দিষ্ট উচ্চারণের আক্ষরিক অর্থের বদলে বক্তার অভিপ্রায় বুঝতে শ্রোতাকে নির্ভর করতে হয় প্রেক্ষিতের বা পরিস্থিতির ওপর, তার সঙ্গে সম্পর্কের ওপর এবং যে বিষয়ে কথা বলা হচ্ছে তার পূর্বসূত্রগুলোর ওপর। অবশ্য এইসব কিছু অনেকটাই বক্তার ওপরেও নির্ভর করে। তিনি কোনো বিষয়ে বিবৃতি দিতে গেলে কীভাবে দেবেন, কতটা স্পষ্টতা আনবেন তাঁর উচ্চারণে। তাই ইমপ্লিকেচার হচ্ছে তাই যা শ্রোতার তরফ থেকে বুঝে নেওয়া হয়, কিন্তু সেই বুঝে নেওয়া কখনোই সেই উচ্চারণের শর্ত-সাপেক্ষ নয়। গ্রাইস দু-ধরনের ইমপ্লিকেচারের কথা বলেছেন। এক হচ্ছে গতানুগতিক (কনভেনশনাল) ইমপ্লিকেচার, অর্থাৎ ভাষায় নির্দিষ্ট কোনো শব্দ নির্ধারিত রয়েছে যা কিছু নির্দিষ্ট ভাষিক অভিপ্রায়কে ব্যক্ত করে পূর্ব-নির্ধারিতভাবে। এর মানে এই নয় যে ইমপ্লিকেচারের যে নিজস্ব চরিত্র অর্থাৎ আক্ষরিকতার বাইরে টেনে এনে শ্রোতাকে অন্যকিছুর দিকে নির্দেশ করা, তার ব্যতিক্রম হয় গতানুগতিক ইমপ্লিকেচারগুলোর মাধ্যমে। আর এক-রকম হচ্ছে আলাপচারী (কনভারসেশনাল) ইমপ্লিকেচার। এই দ্বিতীয় প্রকার আলাপচারী ইমপ্লিকেচারই হল বক্তব্যতত্ত্বের প্রধান উপজীব্য।

অনেকে ইমপ্লিকেচারকে দেখেছেন এইভাবে - যে ইমপ্লিকেচার হচ্ছে কথোপকথনে প্রাথমিক ভাষাগত চাহিদার অতিরক্ত একপ্রকার মানে। এই অতিরিক্ত মানে বক্তার সঙ্গে শ্রোতার সহযোগী নীতিগুলোর কথা মাথায় রেখে কথোপকথনে কাজ করে। যখন আপনি কোনো আড্ডায় কারুর সম্বন্ধে বললেন, হেলে ধরতে পারে না কেউটে ধরতে গেছে তখন খুব স্বভাবতই আপনি সরাসরি কথা বলে ওই উদ্দিষ্টের হামবড়াই ও অক্ষমতা বা অকর্মন্যতার কথা না বললেও আপনার উক্তির প্রযুক্তি ঘটছে সরাসরিই। কারণ বাংলা ভাষায় ওই প্রবচনটা ওইরকম হামবড়াই ও অক্ষমতা বা অকর্মন্যতা-র উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। কিন্তু আপনি কাউকে সহজ আটপৌরে কথাতে বলেন, ও তো মহাপণ্ডিত, তাহলেও আপনি আসলে তার পাণ্ডিত্যের বদলে হামবড়াই ভাবটাকেই খোঁচা দিতে চাইছেন, সেটা ওই আড্ডায় উপস্থিত সকলেই বুঝতে পারবেন যে আপনি মোটেই সত্যি-সত্যিই ওই মানুষটার পাণ্ডিত্যের কথা বলছেন না, আগে-পরে হতে থাকা কথা, আপনাদের নিজের মধ্যেকার সম্পর্ক, প্রত্যেক ব্যক্তির নিজস্ব চরিত্র, ইত্যাদি নানান জিনিসের নিরিখে। সকলেই সত্যিটা জানে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, গ্রাইস বলছেন, এসব ছাড়াও কথোপকথনের কিছু প্রাথমিক চরিত্র আছে। সেগুলোকে তিনি বলছেন কনভারসেশনাল ম্যাক্সিম বাংলা কী করব না জেনেই আপাতত কথোপকথনের নীতি বলছি। গ্রাইস এই রকম চারটে নীতির কথা বলছেন: (ক) কথোপকথনে গুণমান বজায় রাখার নীতি (ম্যাক্সিম অফ কোয়ালিটি): আপনি এই নীতি অনুযায়ী সদা সত্য কথা বলিবেন। যা মিথ্যে বা যার কোনো প্রমাণ আপনার হাতে নেই - সেরকম কথা বলবেন না। (খ) কথোপকথনে পরিমান-বাচক নীতি (ম্যাক্সিম অফ কোয়ান্টিটি): এই নীতিতে বলা হয়েছে: কথোপকথনে যতটুকু - তথ্য পরিবেশনের দরকার ততটুকুই আপনি বলবেন, তার বেশি নয়। (গ) সম্বন্ধের (বা প্রাসঙ্গিকতার) নীতি (ম্যাক্সিম অফ রিলেশন বা রেলেভ্যান্স): কথোপকথনে আপনার ভূমিকা প্রাসঙ্গিক হতে হবে। (ঘ) পন্থার নীতি (ম্যাক্সিম অফ ম্যানার): এই নীতি অনুযায়ী আপনাকে কথোপকথনে দুর্বোধ্যতা বা অস্পষ্টতা এড়াতে হবে। আপনার কথা যেন সংক্ষিপ্ত ও যথাযথ হয়। কথোপকথনের এই নীতিগুলোর পরস্পরের মধ্যে জল-অচল ভাগ নেই। অর্থাৎ কথোপকথনে একাধিক নীতি গ্রাহ্য হতে পারে একই সঙ্গে।

 

একটা জিনিস খেয়াল করবার মতো। এতক্ষণ যে ইমপ্লিকেচার (ইমপ্লিকেচারের ভালো বাংলা লাগিবে) বা ভাষ্যবস্তুর কথা বলেছি, তার জন্য কোনোরকম সংজ্ঞা ধার্য করি নি। ইমপ্লিকেচার বোঝাতে - তার চাইতে বেশি কিছু, অন্য কিছু - এইসব বলেছি। তার মানে, একটা অনুপস্থিতিই এই ইমপ্লিকেচারের কারক। মেরলো-পঁটি যাকে পরোক্ষ ভাষা বলেছেন তার কথা মনে করা যাক। সেখানেও উচ্চারণের মধ্যে ফিজিকাল সাইলেন্সগুলো কীভাবে সামগ্রিক মানে তৈরির ক্ষেত্রে কাজ করে সেকথা আলোচিত হয়েছে। ইমপ্লিকেচারের ক্ষেত্রে বিশেষত কনভারসেশনাল ইমপ্লিকেচারের মধ্যে হয়তো না-বলা বা নৈশব্দ - এসবের চেয়েও বেশি জোর দেওয়া হয় বলা-কথা-র আক্ষরিক মানে পেরিয়ে অন্য কিছু বোঝানোকে। দৃষ্টান্ত আগেও দিয়েছি। আবারও দিচ্ছি।

 

(৪)

(ক) কেউ বললেন, আগামী কাল দুপুরে আমার বাড়ি আসছ তো?

(খ) আপনি বললেন, কাল আমার অফিস আছে।

 

অর্থাৎ, আপনি (৪ক)-এর প্রশ্নের উত্তর দিলেন না। সরাসরি বললে না যে আপনি তাঁর বাড়ি আগামীকাল দুপুরে যেতে পারবেন না। অথচ সেইটাই আপনি বোঝাতে চাইলে অন্য একটা প্রতিবেদন বাক্য দিয়ে - যার আক্ষরিক মানে সম্পূর্ণ আলাদা আপনার অভিপ্রেত মানের থেকে। এখানে কতকগুলো প্রশ্ন ওঠে। প্রথমত, আপনি কি ওই জায়গায় প্রতিবেদন বাক্য ছাড়া অন্য কোনো মেজাজের বাক্য দিয়ে ইমপ্লিকেচার তৈরি করতে পারতেন? ধরুন আপনি যদি ওই প্রশ্নের উত্তরে আর একটা প্রশ্ন করতে (৫) বা (৬)-এর মতো:

 

(৫) তুমি কি কাল তাহলে অফিস যাচ্ছ না?

(৬) কেন কাল দুপুরে তোমার বাড়ি যাবো?

 

তাহলে কি ইমপ্লিকেচার হত? (৫) আর (৬) - এই প্রশ্নদুটোয় হত না। কারণ সেখানে আপনি যা বলছেন তাই আপনার অভিপ্রেত বলা। কিন্তু যদি জিগেস করতেন (৭):

 

(৭) কাল কি তোমার বাড়িতে শ্বেতা আসছে?

 

সেক্ষেত্রে ইমপ্লিকেচারের একটা সম্ভাবনা থাকত। অর্থাৎ, আপনার আর শ্বেতার সাম্প্রতিক মনোমালিন্য/ ঝগড়া/ কথা-কাটাকাটি/আড়ি হয়েছে বা আপনার এবং শ্বেতার সম্প্রতি বিচ্ছেদ ঘটেছে - এইরকম কোনো প্রাকসিদ্ধ যদি পূর্ববর্তী প্রশ্নকর্তার মনে থেকে থাকে তবে তিনি (৭) উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই ধরে ফেলবেন যে আপনি কাল তার বাড়িতে দুপুরে আসছেন না, যদি শ্বেতা আসেন। অথচ আপনি সেটার জন্য আক্ষরিক উত্তর দেন নি। দ্বিতীয়ত, আপনার ইমপ্লিকেচার তৈরির উদ্দেশ্য সব ক্ষেত্রে সফল নাও হতে পারে। যেমন (৮)-এর কথোপকথন,

 

(৮)

(ক) একজন বললেন, কালকের মহিলার গান তোমার কেমন লেগেছে?

(খ) উত্তরে আপনি বললেন, কালকের মহিলাকে দেখতে সুন্দর

 

অর্থাৎ আপনি সরাসরি এড়িয়ে গেলেন প্রশ্নটার উত্তর। কথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মানে তো একাধিক হতে পারে। হতে পারে ওই মহিলা গান তো খুবই ভালো গেয়েছেন, উপরন্তু তাঁর রূপও আকর্ষণীয়। ফলে আপনার ভালোই লেগেছে সব মিলিয়ে। আবার এও হতে পারে, আপনার মনে হয়েছে, ধুস ও আবার গান হল নাকি! কিন্তু যিনি আপনাকে নিয়ে গিয়েছিলেন - তার মুখ রক্ষার্থে সরাসরি আপনার গান খারাপ লেগেছে না বলে আপনি বললেন মহিলাকে দেখতে ভালো। বরং সেইটা নিয়ে কথা বলা যাক। - এই রকম কিছু বলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আপনার সহ-বক্তা ধরলেন প্রথম অভিপ্রেত অর্থে। অর্থাৎ ওই মহিলার রূপে-গুণে আপনি মুগ্ধ। এই হচ্ছে কনভারসেশনাল ইমপ্লিকেচারের মুশকিল। এবার কীভাবে আমাদের সংস্কৃতিতে কথোপকথন চলে, কীভাবে সামাজিক মিথষ্ক্রিয়ায় আমরা অংশগ্রহণ করি - তার কিছু শর্ত থাকে - যেগুলো নানা সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ভেতর দিয়ে তৈরি হয়। গ্রাইস তাঁর চারটে নীতির মধ্যে দিয়ে ওই শর্তগুলোর কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে। একটা বাচ্চা এনোরমাস কেপেবিলিটি নিয়ে জন্মায়। সেই কেপেবিলিটি প্রাথমিকভাবে বিমূর্ত থাকে এবং পরে সেই কেপেবিলিটির অনেকটাই ছাঁটাই হয়ে যায় শিখন প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে। সে প্রশ্ন নিয়ে এখানে বিস্তারিত বলব না। কিন্তু যতটুকু তার পড়ে থাকে ততটুকু নিয়ে সে সামাজিক প্রতিষ্ঠানের অংশীদার হয়ে বিভিন্ন অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যাবার সময় তার নিজের সমাজ ও সংস্কৃতির শর্তসাপেক্ষে সে একজন দক্ষ ভাষী হয়ে ওঠে এবং সেই দক্ষতা নিয়েই সে - কথোপকথনে অংশগ্রহণ করে।

 

গ্রাইসের ওই নীতিগুলো তাই কথোপকথনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। ওই নীতিগুলোর সাহায্যেই আমরা কথোপকথনের অভিপ্রেত মানের সন্ধান পাই। কিন্তু একটা কথোপকথনে ওই নীতিগুলো কাজ করে বলেই তার ব্যতিক্রম হলেও আমরা বক্তার অভিপ্রায়ের বিশেষ দিকটা জানতে পারি। অর্থাৎ বক্তার উচ্চারণের আক্ষরিক মানের বাইরেও যে বক্তার অভিপ্রায় নিহিত থাকে সেটা বুঝতে পারি। শুধু তাই নয়, কথোপকথনের কিছু নিজস্ব নিয়মও থাকে যেগুলো কথা বলবার সময় দক্ষ বক্তা বা শ্রোতা - উভয়েই অনুসরণ করে এবং সে নীতিগুলো জানে বলেই - স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে কথোপকথনে, এবং সেখানে একে-অপরের উচ্চারণের অভিপ্রেত মানে বুঝতে পারে।

 

[৭]

বক্তা যখন কথা বলেন তখন তিনি অনেক কিছু আগাম ধরে নেন বা তাঁর মনে আগে থাকতেই তাঁর নিজের বা অন্য কারুর সংস্কৃতি-র সাপেক্ষে ওই বিশেষ পরিস্থিতি-তে কথা বলা-র অবস্থা, শ্রোতার পরিচয় ইত্যাদি সম্বন্ধে ধারণা থাকে। বক্তার এই ধারণা মূলত তথ্যের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা। কোনো ভাষার একটা উচ্চারণকে কেন্দ্র করে যে-সমস্ত অনুমান জড়িয়ে থাকে তার একটা ধরন হচ্ছে প্রাকসিদ্ধ বা প্রিসাপোজিশন। এক্ষেত্রে দুরকম ধারণার কথা বক্তব্যতত্ত্বে আলোচিত হয়: প্রতিপাদন ও প্রাকসিদ্ধ। প্রতিপাদন হল, বাক্যের মানেগুলোর বা প্রোপোজিশনগুলোর মধ্যেকার সম্পর্ক। পূর্বধারণার ধারণা বিশেষত বক্তব্যতত্ত্বে বোঝা হয় বক্তা এবং প্রোপোজিশনের সম্পর্কের ভিত্তিতে। ওই দুই ধারণাই দু-রকমের সম্পর্কের কথাই বলে। একটা কোনো নির্দিষ্ট উচ্চারণে, আগে থাকতেই ধরে নেওয়া হয়েছে এমন একটা প্রোপোজিশনের স্বত্ব থাকতেও পারে আবার না-ও পারে।

 

(৯)

(ক) যদুর এক থালা ভাত খেল

(খ) যদুর খিদে মিটল

 

(১০)

(ক) দিলীপ এবং যদু, দুজনেই দিল্লী গিয়েছিল

(খ) দিলীপ দিল্লী গিয়েছিল

 

এই দু-জোড়া বাক্যের মধ্যে খেয়াল করলেই দেখা যাবে যে যদি জোড়া বাক্যের প্রথমটা যদি সত্যি হয়, তাহলে দ্বিতীয়টাও সত্যি হতে বাধ্য। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, এই সম্পর্ক আধেয়তাত্ত্বিক সম্পর্ক। এই সম্পর্ক সমস্তরকম সম্ভাবনাকেই ধরে রাখে। এমনকি সেই সম্ভাবনা বাস্তবে প্রতিফলিত না হলেও।

 

এবার বলি, প্রাকসিদ্ধের কথা। প্রথমত, প্রাকসিদ্ধ হচ্ছে উচ্চারণের একধরনের নিহিতার্থ। বক্তা যে কথা বলছেন শ্রোতা সেই কথার নিহিতার্থ অনুমান করে নিতে পারেন। যেমন, আপনি কলকাতায় যাচ্ছেন শুনে আমি বললাম, আজ ব্রিগেডে মিটিং আছে, সঙ্গে সঙ্গে আপনিও আমার ওই উচ্চারণের নিহিতার্থ উপলব্ধি করে কলকাতায় সম্ভাব্য যানজট, ট্রেনে ভিড় হওয়া, ইত্যাদি সম্পর্কে অনুমান করে নিলেন। কারণ আমি আর আপনি দুজনেই ব্রিগেডে মিটিং নামক ঘটনার পটভূমি সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল। দ্বিতীয়ত, প্রাকসিদ্ধ বাক্যের ধরন-নির্বিশেষে অক্ষত থাকে। অর্থাৎ বাক্যটা - না-বাচক বা প্রশ্নবোধক হতে পারে। হতে পারে বাক্যটায় বাক্যে মেজাজগত চরিত্র বজায় রাখতে সেখানে কোনো বিশেষ উপাদান মজুত আছে বা শর্ত-সাপেক্ষতাও থাকতে পারে। উচ্চারণ বা বাক্য যে-ধরনেরই হোক না কেন, প্রাকসিদ্ধ অক্ষত থাকবে। যেমন, ধরা যাক নিচের বাক্যগুলো (১১ক থেকে ১১ছ)।

 

(১১)

(ক) নঈম পেটে ব্যথার কারণে আজ ইস্কুলে গেল না

(খ) নঈম পেটে ব্যথা সত্ত্বেও কিন্তু সে আজ ইস্কুলে গেল

(গ) নঈম কি আজ ইস্কুলে যাবে?

(ঘ) নঈম ইস্কুলে গিয়ে আজ কী টিফিন খাবে?

(ঙ) নঈম আজ ইস্কুলে যাবে তাই সকাল সকাল সে ব্যাগ গুছিয়ে রাখল

(চ) নঈম ইস্কুল যা (অনুজ্ঞা)

(ছ) নঈমের আজ ইস্কুল যেতে ইচ্ছে করছিল না কারণ তার আজ রেজাল্ট বেরবে

 

ওপরের দৃষ্টান্তগুলোর মধ্যে যেমন বিভিন্ন মেজাজের বাক্য রয়েছে (প্রতিবেদন, দু-রকমের প্রশ্ন, না-বাচক, ইত্যাদি) তেমনই রয়েছে বিভিন্ন গঠনের বাক্যও। কিন্তু সব-কটা বাক্যের ক্ষেত্রে যে প্রাকসিদ্ধটা কাজ করছে সেটা অভিন্ন: নঈম ইস্কুলে যায়। মনে রাখতে হবে এই প্রাকসিদ্ধকে নেতি দিয়ে, প্রশ্ন দিয়ে, মেজাজ দিয়ে পালটে ফেলা যায় না। এমনকি যদি বাক্যে প্রাকসিদ্ধের প্রতিপাদন (এন্টেইলমেন্ট) নাও থাকে। যেমন, যদি কেউ বলেন, নঈমের ইস্কুলে আজ থেকে নতুন হেডমাস্টার আসবেন - সেখানে নঈমের ইস্কুলে যাবার প্রসঙ্গ সরাসরি না থাকলেও, প্রাকসিদ্ধ: নঈম ইস্কুলে যায় অপরিবর্তিতই থেকে যাবে। যখন উচ্চারণে সরাসরি প্রাকসিদ্ধের প্রতিপাদন নেই - তখন সেই অভিব্যক্তিকে বক্তব্যতত্ত্বের এলাকায় কনভেশনাল ইমপ্লিকেচার দিয়েও বুঝতে পারা যায়। কিন্তু যখন বিয়োজক অব্যয় হিসেবে বাংলা ভাষায় কাজ করে - তখন সেটা প্রথাসিদ্ধ বা কনভেনশনাল ইমপ্লিকেচার। একই রকম ভাবে (১১ক, খ, ঙ, ছ) - এই সবকটা বাক্যেই প্রথাসিদ্ধ ইমপ্লিকেচার হিসেবে উপস্থিত রয়েছে যথাক্রমে: কারণে, সত্ত্বেও, তাই, কারণ, ইত্যাদি। অর্থাৎ কিন্তু যেখানে জ্ঞানেন্দ্রমোহন অনুযায়ী বিয়োজক অব্যয় আর সুনীতিকুমার ধরলে প্রতিষেধক বা প্রাতিপাক্ষিক অব্যয়, যা সম্বন্ধ- বা সংযোগ-বাচক অব্যয়-এরই এক প্রকার - সেখানে কিন্তু সরাসরি প্রথাগত ইমপ্লিকেচার। যেমন (১২) এবং (১৩),

(১২) আমি পুকুরে নামব কিন্তু তুমি নামবে না

(১৩) নিখিল সলিলের বাড়ি গেল না কিন্তু দিলীপ গেল

(১২) এবং (১৩) দুটো বাক্যেই বক্তব্যের বৈপরীত্য পাশাপাশি বসানো হয়েছে যার মধ্যস্থতা করছে ওই কিন্তু। দুটো পরস্পরবিরোধী বাক্যাংশ যেমন, (১২)-এ আমি পুকুরে নামব এবং তুমি পুকুরে নামবে না এবং (১৩)-তে নিখিল সলিলের বাড়ি গেল এবং দিলীপ সলিলের বাড়ি গেল না এই পরস্পরবিরোধী জোড়া বক্তব্যকে কিন্তু সংযুক্ত করে রেখেছে এবং ব্যাকরণের নিয়ম অনুযায়ী দ্বিতীয় বাক্যাংশের যে গ্যাপিং বা ফাঁক যেমন, (১২)-এর দ্বিতীয় বাক্যাংশে পুকুরে এবং (১৩)-এর দ্বিতীয় বাক্যাংশে সলিলের বাড়ি বাদ পড়ে যাওয়ার পেছনেও ওই সুনীতিকুমার কথিত সম্বন্ধ কথাটার প্রভাব রয়েছে। তাই বাঙালি বক্তা দ্বিতীয় ক্ষেত্রে একই জিনিসের পুনরাবৃ্ত্তি থেকে বিরত থাকছেন। কিন্তু যখনই কিন্তু দুই বাক্যাংশের মধ্যবর্তী সেতুর কাজ করল না, সে কর্তার ডানদিকের জায়গাটায় উঠে গেল এবং সেই বাক্যটাও আর যৌগিক বাক্য রইল না, তখন কিন্তু কিন্তু-কে প্রথাসিদ্ধ ইমপ্লিকেচার তৈরির কারক বলা যাবে না। তখন সে হয়ে উঠবে - কথোপকথন-মূলক বা কনভারসেশনাল ইমপ্লিকেচারের কারক। অর্থাৎ যেখানে বক্তার ভূমিকার চাইতেও শ্রোতার ভূমিকা প্রকট।

 

[৮]

এখন কথা হচ্ছে, আমরা কেন এইসব পড়ব? কী লাভ হবে কথোপকথনের বা মানুষের আটপৌরে ভাষার এইসব কারসাজি জেনে? এইসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া প্রয়োজন খুব সন্তর্পনে। যেমন, এই কিন্তু-র মতো অকিঞ্চিতকর শব্দগুলো আমাদের এত ভাবাচ্ছে কেন এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিতে গেলে বলতে হয় ভাষার পৃথিবীতে এত কাণ্ড ঘটছে, পাঠক খেয়াল করে দেখবেন, সারাদিনে, খবরের কাগজ থেকে শুরু করে, টেলিভিশনের নিউজ, সিনেমা, সাহিত্য, নাটক, গান, মানুষের নিত্য-প্রয়োজনীয় তথা নিত্য-স্বতঃস্ফূর্ত পারস্পরিক সম্বন্ধ; যেমন দোকানে গিয়ে জিনিস কেনবার সময়, বাড়িতে ফিরে চা চাইবার সময়, নেতা বা আমলাদের কাছে গিয়ে তদ‍্‍বির করবার সময় আক্ষরিক অর্থেই সর্বত্র সবসময় আপনাকে ভাষার সাহায্যই নিতে হয়। ভাষার সাহায্য নিতে হয়, অথচ সেই ভাষা সম্বন্ধে আমরা সচেতন নই। বক্তব্যতত্ত্ব অনুযায়ী, স্থান-কাল-পাত্র ভেদে কোথায়-কখন-কী বলতে হয় তা নিয়ে কোনো ভাষার লোক মহিলা-পুরুষ নির্বিশেষে, বাচ্চা-বুড়ো কাউকেই প্রায় আলাদা করে সচেতন করে তুলতে হয় না। বক্তব্যের এই প্রাসঙ্গিক ব্যবহার ভাষার ব্যবহারকারীমাত্রই জানেন তাঁর নিজের ভাষার পরিপ্রেক্ষিতে। এই জানা এমন স্তরে পৌঁছে যায় যে একে মানুষের বক্তব্যতাত্ত্বিক জ্ঞান (বা প্রাগমাটিক কম্পিটেন্স) বলা হয়। অর্থাৎ ভাষাজ্ঞানের ক্ষেত্রে এই জ্ঞান এক বিশেষ জ্ঞান।

সেই কারণে এই উপাদানগুলো কথা আপনাদের জানিয়ে রাখা, যা আপনারা নিজের অজান্তেই ব্যবহার করেন। অসচেতনভাবেই। অথচ সেই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র উপাদানগুলোর জগত কত বড়। বিশাল। পাঠককে খেয়াল রাখতে বলব, বক্তব্যতত্ত্ব বা প্রাগমাটিক্স থেকে প্রাগমাটিজম বা প্রয়োগবাদ বলে একটা কথার জন্ম হয়েছে। এই প্রয়োগবাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োগ দেখা যায় শিক্ষাক্ষেত্রে। এও একধরনের শিক্ষাদর্শন যার মাধ্যমে বলা হয় শিক্ষাকে হতে হবে জীবন এবং জীবনের বিকাশ সংশ্লিষ্ট। প্রয়োগবাদ শিক্ষার ক্ষেত্রে কয়েকটা জিনিসের ওপর জোর দেয়। যেমন, বাস্তবিক শিক্ষা যে পাঠ শিশুদের দেওয়া হচ্ছে বাস্তবে সেই পাঠের প্রয়োগ কী সে বিষয়ে জ্ঞান অর্জন না করলে শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। দ্বিতীয়ত, অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে শিক্ষালাভ। আলাদা করে একটা জিনিসের সংজ্ঞা দিলাম এবং তার দৃষ্টান্ত দিয়ে বোঝালাম এইটা হচ্ছে ওই সংজ্ঞায়িত বিষয়ের বাস্তব চেহারা, যা সম্বন্ধে শিক্ষার্থী আমার দেওয়া সংজ্ঞা থেকে জ্ঞান অর্জন করেছে এমন নয়। বরং বাস্তবের অভিজ্ঞতার ভিত্তিটাকে চোখের সামনের রেখে শিশুকে শেখানো তার দেখা দৃষ্টান্ত আসলে কোন বিষয়ের অংশ। গণতন্ত্রে বক্তব্যতত্ত্বের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এ কথা আগে ভাগে বলে রাখলে গোটা রচনাজুড়ে পাঠকের মনে এই ভাবনা জাগরূক থেকে তাকে দেখাতে দেখাতে এগোবে যে পরিস্থিতির সাপেক্ষে মানুষ কীভাবে স্বতঃস্ফূর্ত ভঙ্গিতেই নিজেকে বদলে নেয় আর তার কথালাপের ভিত্তিকেই সে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। ইমপ্লিকেচারের দৃষ্টান্ত পেশ করতে গিয়ে এমন একটা উক্তি টেনে এনেছিলাম যা থেকে খুব সহজেই বোঝা গিয়েছিল, গণতন্ত্রের রাজনৈতিক ভাষ্য রচনা করতে গেলে কেমন ভাবে ভাষায় সংশ্লিষ্টতা টেনে এনে কথা বলতে হয়। আমি অশ্বত্থামা হত ইতি গজ-র কথা বলছি।

বাংলা ভাষার (আমি আপাতত স্ট্যান্ডার্ড বাংলার কথাই বলছি) জগতে কিন্তুর দাপট ও মহিমা সচক্ষেই দেখতে পাচ্ছেন একটামাত্র দৃষ্টান্তের নিরিখেই। কিন্তু-র বিশেষ প্রয়োগ ছেড়ে দিলেও যা পাওয়া যায় তাও নেহাত কম কিছু নয়। কিন্তু-ই এমন একটা অব্যয় যা বাংলা ভাষায় পরিভাষায় পরিণত হয়েছে। ইংরিজিতেও খেয়াল করবেন, লোকে বলে দেয়ার আর মেনি ইফস অ্যান্ড বাটস্। সেইরকমই বাংলায় লোকে বলে (১৪ এবং ১৫)-র মতো বাক্য।

(১৪) অত কিন্তু কিন্তু কোরো না, কাজটা করে ফেল

(১৫) দিলীপ বাজার যাবার আগে কিন্তু কিন্তু করছিল

 

বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই জোড়া কিন্তু ব্যবহার করে বাঙালিরা কোনো কাজের নেতি-বাচক ইতস্তত করার ভাবকে ব্যক্ত করে। যেমন, তুমি যাবে বলছ ঠিকই কিন্তু আমার মন খুঁতখুঁত করছে। এই ক্ষেত্রে বাক্যে কিন্তু-র ব্যবহার অনেক সোজা-সাপটা। পাশাপাশি (১৪) এবং (১৫)-য় ওই বাক্যগুলোতে কিন্তু কিন্তু মনের একটা দ্বিধান্বিত ভাবমাত্র। আবার অনেক সময় ইংরিজির অনুকরণে বাঙালি বলেও থাকে তোমার ওই কিন্তুগুলো মন থেকে ঝেড়ে ফেল তো!, কিন্তু একটা কিন্তু আছে যে!, ইত্যাদি। এই ব্যবহার ইংরিজির বাক্যের প্রভাব বলেই তো প্রাথমিক ক্ষেত্রে মনে হয়!

একটা জিনিস উল্লেখ করার মতো জ্ঞানেন্দ্রমোহনে কিন্তু-র যে প্রাদেশিক অর্থের কথা বলা হয়েছে সে তো বিয়োজক অব্যয় কিন্তু চাইতে আলাদা। যখনই কিন্তু তার প্রথাগত ব্যবহারের চেয়ে আলাদা হয়ে গেল তখন জ্ঞানেন্দ্রমোহনকেও সেই দৃষ্টান্ত পেশ করার জন্য একটা পৃথক বাক্যের বদলে একাধিক বাক্য ব্যবহার করে বক্তব্যের পরিস্থিতি-টা বোঝাতে হল। এই ক্ষেত্রে না-হয় কিন্তু কেবল বিশেষ্যর রূপ ধারণ করেছে, যাকে আমি একটু আগেই পরিভাষা বলছিলাম। কিন্তু কিন্তু যখন ক্রিয়া-বিশেষণের মতো আচরণ করে বক্তব্যে ব্যবহৃত ভাষা-চেহারার অতিরিক্ত কিছু বলতে চাইছে, প্রযুক্ত করতে চাইছে বা সংশ্লিষ্ট করতে চাইছে তখন কিন্তু-কে আজকালকার বক্তব্যতত্ত্বের পরিভাষা অনুযায়ী বলতে হয় সন্দর্ভ কণিকা বা ডিসকোর্স পার্টিকেল। এই ক্ষেত্রে, যেমন প্রথম দৃষ্টান্ত (১খ)-এর উচ্চারিত বাক্য দেখাতে গিয়ে আমাদের গোটা একটা পরিস্থিতি কল্পনা করে নিয়ে কথা এগোতে হয়েছে।

কিন্তু-কে আপাতত যদি তিন রকমের ধরে নিই। এক হচ্ছে, বিয়োজক বা প্রতিষেধক বা প্রাতিপাক্ষিক অব্যয়, দুই হচ্ছে বিশেষ্য বা পরিভাষা, আর তিন হচ্ছে সন্দর্ভ কণিকা। এই তিন কিন্তু গণতন্ত্রের একটা ত্রিভুজ তৈরি করে। ত্রিভুজের এক বাহুতে কিন্তু বলে রাষ্ট্র, আর এক বাহুতে কিন্তু বলে দেশের সচেতন নাগরিক আর আর-এক বাহুতে কিন্তু বলে তারা যাদের কথা কেউ শোনে না। অর্থাৎ ক্ষমতার বিন্যাসের একদিকে সবচেয়ে ক্ষমতাশালী, আর-এক দিকে ক্ষমতা যাদের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং তৃতীয় দিক হচ্ছে আক্ষরিক অর্থেই তৃতীয়। ধরা যাক, বর্তমান পরিস্থিতি গোটা বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে লক্ষ-লক্ষ মানুষ আক্রান্ত। ভারতবর্ষে সংক্রমণ বাড়লে গোটা চিত্রটা ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে (১৬) এবং (১৭)-এর মতো বাক্য:

(১৬) বাংলাদেশে সামাজিক দূরত্ব প্রয়োগ করতে পুলিশের লাঠিপেটায় ক্ষোভ, কিন্তু পুলিশ বলছে এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা

(১৭) যারা রেগেছেন তাদের কাছে ক্ষমা চাইছি, কিন্তু দেশকে সুরক্ষিত রাখতেই লকডাউন (মোদি)

এ তো গেল এক-নম্বর বাহুর কিন্তু। অর্থাৎ কিন্তু-র পরে কিন্তুর আগে কৃতকর্মের ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে সরকারের তরফ থেকে। ক্ষমতার বিন্যাসের এই ওপরতলার হিসেবটা সব সময় একরকম নয়। খুব মন দিয়ে লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে (১৬) এবং (১৭)-এর কিন্তু আসলে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তের খুব বিনম্র ব্যাখ্যা। রাষ্ট্র এই কিন্তু-র মাধ্যমেই সে যে গণতান্ত্রিক মানবদরদী রাষ্ট্র সেটা বোঝানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু একই ক্ষমতার বৃত্তে একই কিন্তু-র প্রয়োগের কোনো মূল্য নেই ওই একই রাষ্ট্রের কাছে। যেমন, (১৮)-এর বাক্য:

(১৮) আমি আগেও আধারের জন্য আবেদন করেছি কিন্তু পাইনি, এইজন্য আমি পুনরায় আবেদন করেছি।

কিন্তু তবু এই কিন্তু-র মাধ্যমেই জনগনকে নিরন্তর রাষ্ট্রের সঙ্গে কথা চালিয়ে যেতে হবে। বিনয়ী হয়ে অহিংস হয়ে। যদি এমন কথা বলা হয়, যে এখনকার আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে কিন্তু বলা লোকের বড় অভাব। সেখানে কিন্তু-র জায়গায় এবং গুরুত্ব বেশি। তাহলে কি চিত্রটা বোঝানো যাবে? গণতন্ত্রকে তার পরম প্রিয় বন্ধু পুঁজিবাদ তো শিখিয়েছে জনগনই ঈশ্বর এবং সেই ঈশ্বরই সর্ব-শক্তিমান ক্রেতা সুতরাং সেই ক্রেতার কাছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে বিনয়ী থাকতে হবে কেননা একই সঙ্গে সুচিন্তিত নাগরিকও বিশ্বাস করে, গণতন্ত্র-ই হচ্ছে শান্তিকামী মুক্তির একমাত্র জরুরি অবস্থান, যেখানে (১৮)-বলা বাক্যের মতো বাক্য একজন নাগরিক তাঁর রাষ্ট্রের বিরূদ্ধে কথা বলারও অধিকার জন্মায়। রাষ্ট্র সে কথায় আমল দেবে কিনা সেটা ভিন্ন প্রশ্ন। কিন্তু সম্বন্ধ বা বিয়োজক অব্যয় কিন্তু-ই সদা সর্বদা নাগরিকের মনে রাষ্ট্র সম্বন্ধে প্রশ্নকে জাগিয়ে রাখতে পারে।

 

দুই নম্বর বাহুতে যে নাগরিকরা কিন্তু কিন্তু করেন বা মনের মধ্যে থাকা কিন্তু-টাকে ফেলে দিতে পারেন না তাঁরা সংশয়বাদী। অর্থাৎ যাঁরা কিন্তু-টাকে পরিভাষায় পরিণত করেছেন তাঁদের মধ্যে দিয়েই কিন্তু-র সর্বোত্তম প্রকাশ। কিন্তু-র ইতিহাস লিখবেন তাঁরাই। কিন্তু ত্রিভুজের তিন নম্বর বাহুর যে কিন্তু সে এক হতচ্ছাড়া এবং সর্ব-শক্তিমান। একটা ভাইরাস যেমন মানব শরীরে ঢুকে শক্তিমান হয়ে ওঠে তেমনই এই তৃতীয় কিন্তু, নাগরিকের বিনয়ী ভাবের মধ্যে ফুটিয়ে তোলে অপর এক বৃত্তান্ত। কিন্তু সেই সন্দর্ভ কণিকার হয়ে ওঠার পেছনে যে হাজার বছরের ইতিহাস তার খবর আমরা জানি না। যেমন ধরুন (১৯)-এর বাক্যটা:

(১৯) মৃত্যুভয় কিন্তু সেভাবে নেই, বন্দিদশা কবে ঘুচবে, সেটাই এখন সবার দুশ্চিন্তা

এই কিন্তু একবারে প্রথমে উল্লিখিত (১খ)-এর কিন্তুর সঙ্গে অবস্থানগতভাবে অভিন্ন। কিন্তু-র (১৯)-এ তেমন রুখে দাঁড়ানোর ভাব নেই যেটা (১খ)-তে আছে। এই কিন্তুরা সারাজীবন রুখে দাঁড়ানোরই চেষ্টা করে। সফল কম হলেও এর নিজস্ব চরিত্র নিচুতলার মানুষকে নম্রভাবে প্রতিবাদ করতে শেখায়। এখন, (১খ)-এর বাক্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে যে পরিস্থিতি কল্পনা করেছি, সেই পরিস্থিতি অন্য কোনো রকমও হতে পারত। ধরা যাক (১খ)-এর বাক্যটা এক পাঁচ বছরের শিশুর উচ্চারণে পাওয়া গেল, ঘরের মধ্যে। তখনও কিন্তু সামগ্রিক অবস্থায় একরকম রুখে দাঁড়ানো, ক্ষমতার ওপরতলায় থাকা অস্তিত্ত্বকে সাবধান বা সতর্ক করে দেওয়ার প্রচেষ্টাই লক্ষ্যনীয়। কী রকম? আরে, খুব সহজ, ওই যে বাচ্চাটা প্রতিদিন সন্ধেবেলায় ওর খিদে পায়। ও-ও বুঝে গেছে, এই সময় বাড়িতে যাঁরা তার কাছে খাবার এনে দেবে তাঁরা অন্যান্য কাজে, যেমন, টিভিতে সিরিয়াল দেখায় ব্যস্ত। হয়তো মা তার বাচ্চাকে আয়ার কাছে রেখে কাজে যায়। সেই আয়া সন্ধের সিরিয়ালটা মিস করতে চান না। অথচ বাচ্চাটার প্রতি দিন খিদে পায়। তাই বাচ্চাটাও (১খ)-এর মতো উচ্চারণ করে, যেখানে কিন্তু ওই সম্বন্ধ অব্যয়ের মতো কৃতকর্মের ব্যাখ্যা করে না। বরং অন্যের কৃতকর্মে চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন তোলে যেখানে ব্যক্তি মানুষ নিজেকে এই সংসারের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে মাথা তোলবার চেষ্টা বজায় রাখে ওই কিন্তু বাক্যাংশ বা ক্লজের মাথায় না বসিয়ে নিজের সম্বন্ধ পদ হিসেবে নিজের অস্তিত্ত্বের ওপর জোর দেওয়ার জন্য নিজের অথবা কর্তার ঠিক পরে বসায়। (১খ)-এর বাক্যকে যদি (২০)-এর মতো করে বলা হতো:

(২০) কিন্তু আমার খিদে পেয়েছে

তাহলে সেক্ষেত্রে পূর্ববর্তী কাজের বা ঘটনার একটা বিপ্রতীপ কোণ হয়তো তৈরি করা যেত কিন্তু সেখানে আমি-র গুরুত্ব কমে যেত। তাই কিন্তু আমি-রই আর-এক রূপ আমার-এর ঠিক অব্যবহিত পরে বসিয়ে তাকে সমগ্র ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা হল। ঠিক একইভাবে যদি কখনো কর্তা বাদ দিয়ে কর্মকেও এই-রকম জোরালো করে তুলতে হয় তাহলেও কিন্তু-কে তার ঠিক অব্যবহিত পরেই বসানো হয়। যেমন, (২১)-এর বাক্যটা খেয়াল করুন।

(২১) দিলীপ ভাত কিন্তু খেল না, রুটি খেল।

(২১) এই বাক্যে দিলীপের ভাত না খাওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ বেশি দিলীপের সামাজিক অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য। তাই এখানে কিন্তু ওই বাক্যের কর্ম ভাত-এর ঠিক পরে বসেছে। যদি কমা দিয়ে বলে না-দেওয়া হত রুটি খেল, তাহলে দিলীপ ভাত কিন্তু খেল না-র হাজারো ব্যাখ্যা করা যেত। সেটা করলাম না কিন্তু-র পরিস্থিতি-সাপেক্ষ বিশ্লেষণ প্রলম্বিত হবে বলে। যেমন ভাবে কিন্তু কর্তা ও কর্মের পরে বসেছে, সেই একই ভাবে সে ক্রিয়ার পরেও বসতে পারে। যেমন, (২২)-এর বাক্যগুলো:

 

 

(২২)

(ক) তুমি একবার সঞ্চিতাদের বাড়ি যেও কিন্তু

(খ) আমার খিদে পাচ্ছে কিন্তু

(গ) দরজাটা বন্ধ করে দাও কিন্তু

এই সমস্ত ক্ষেত্রেই কিন্তু গোটা কর্মসূচি যা ক্রিয়ার মধ্যে সংশ্লিষ্ট রয়েছে তার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রাকসিদ্ধের কথা বলতে গিয়ে বাক্যের গঠন ও মেজাজ নিরপেক্ষ অবস্থায় প্রাকসিদ্ধ কাজ করে তেমনই দেখানো হচ্ছে এই কিন্তু যখন সন্দর্ভ কণিকা তখন সে প্রতিবেদন বাক্য (ডিক্ল্যারেটিভ সেন্টেন্স) যেমন (২২খ) আর এবং নির্দেশমূলক বাক্য যেমন (২২ক) এবং (২২গ) ইত্যাদিতে নির্দিধায় বসতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে প্রাকসিদ্ধের পরিবর্তন ঘটে না। যদিও সন্দর্ভ কণিকা হিসেবে কিন্তু বাসা বাঁধতে পারে না প্রশ্ন বাক্যে: (২৩) ও (২৪) যে-কারণে বাংলা ব্যাকরণে অচল বাক্য (অচল বাক্যের নমুনায় * চিহ্ন দেওয়া হয়)।

(২৩) *তুমি কিন্তু কী খাবে?

(২৪) *দিলীপ কিন্তু কি আজ কলকাতায় যাবে?

দেখা যাচ্ছে বাংলার দু-রকম প্রশ্নেই (ক-প্রশ্ন যা ইংরিজিতে ডব্লিউ-এইচ প্রশ্নের সমতুল এবং মেরু-প্রশ্ন বা পোলার কোয়েশ্চেন যার উত্তর কেবল মাত্র হ্যাঁ এবং না দিয়ে দিতে হয়) কিন্তু অচল। সে আপনি বাক্যের যেখানেই কিন্তুকে বসান না কেন। অথচ প্রশ্নের মেজাজ তুলে নিলেই কিন্তু দিব্বি বসতে পারে (২৫)-র বাক্যে। যেমন আপনি বলতেই পারেন, তুমি কিন্তু কী খাবে এখনও বললে না! এই রকম কিন্তুর আর একটা মজার দিক রয়েছে সেটা হল অতীতকালের বাক্যে এর ব্যবহার। নিচের বাক্য দেখা যাক।

(২৫) তুমি কিন্তু শ্যামলের বাড়ি গিয়েছিলে [বা এর যে কোনো বৈচিত্র্য: তুমি শ্যামলের বাড়ি কিন্তু গিয়েছিলে, তুমি শ্যামলের বাড়ি গিয়েছিলে কিন্তু, সবই সচল]

 

কিংবা, দৃষ্টান্তের বাক্যগুলো দেখে বা তার গ্রহণযোগ্যতা দেখে মনে হতে পারে কিন্তু বোধহয় বর্তমান কালের কর্তৃবাচ্যে ব্যবহৃত হয় না। না না হয়। এই দেখুন না আপনি তো কাউকে বলতেই পারেন যে আমি কিন্তু সিগারেট খাই কিংবা তুমি বারণ করলে তাও সঞ্চিতা কিন্তু শ্যামলের বাড়ি যাচ্ছে। ওতে অসুবিধে নেই। সমস্যাটা হচ্ছে, ক্রিয়ার কাল, বাচ্য, বাক্যের মেজাজ এইসব কিছুর নিরিখে কিন্তু-র অবস্থানের বাক্যতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা মোটামুটি সামঞ্জস্য রেখে দেওয়া গেলেও, বক্তব্যতাত্ত্বিক ব্যাখ্যার মধ্যে ঢুকে পড়ে হাজারো ফ্যাঁকড়া। সেই কারণে বিশ্বজনীন সারবাদী বিজ্ঞান হিসেবে বক্তব্যতত্ত্ব ততটা সক্রিয় নয়, যতটা পরিস্থিতি-সাপেক্ষ ব্যাখ্যায়।

 

Copyright 2020 Sibansu Mukherjee Published 1st Sep, 2020.

image004

image005