তন্ময় ধরের কবিতা

তন্ময় ধর আবহবিদ্যা ও জলবায়ুবিদ্যা সংক্রান্ত গবেষক। ২০০২ সাল থেকে ছোট পত্রিকায় লেখালিখির জগতে। কবিতায় পাশাপাশি জনপ্রিয় বিজ্ঞানরচনা, শিশুসাহিত্যেও লেখেন। উষ্ণিক নামের একটি কবিতা-ওয়েবজিনের সম্পাদনা করেন। এযাবৎ প্রকাশিত হয়েছে পাঁচটি কবিতার বই।

 

image003

 

অখাদ্য (ধারাবাহিক)

 

 

একটা স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি আস্তে আস্তে মাংস কাটতে শুরু করল আমাদের ভিতরে। আমাদের নখে, দুধে, নশ্বরতায় একটু অস্বাভাবিকত্ব এল। সংসার গুছোতে গিয়ে বইয়ের ভাঁজ থেকে বেরিয়ে এল শাদা মথ। আর ছুরির অভ্যেস হঠাৎ করে বাড়িয়ে দিল শরীরের অম্লতা।

 

গোলাপী একটা রঙ জাঁ রেনোয়ার আঙুল ছিঁড়ে ঢুকে পড়ল আমাদের প্রত্যঙ্গে ও আগুনে। রান্নাঘরের বুক থেকে অর্ধেক আলো নিভিয়ে আমরা বুঝলাম বিরিয়ানির গন্ধটা বড্ড বেশী প্রাগৈতিহাসিক হয়ে গিয়েছে।

খাদ্যের নীচে এক বোবা কান্নায় তখন মাংস জড়ো হচ্ছে। অভিনয় থেকে সরে যাচ্ছে তীব্র ঠান্ডা হাওয়া। জিভের নীচ থেকে সরে যাচ্ছে জীবাশ্মবোধ।

 

 

 

মুখগহ্বরের রঙে ইতিহাস অকেজো হয়ে পড়ছে। আর খন্ড খন্ড উত্তাপের শরীরে অন্যমনস্ক একটা পোড়া গন্ধ উঠছে। এখানে মাংসের দাগ থেকে আমি অদৃশ্যে উঁকি দেব। দেহশূন্য আকাশ ও পাখিদের খেলাধুলা থেকে সামান্য ভুল রেখে দেব স্বাদকোরকে।

 

ধরা যাক, লালারসের কোন ভবিষ্যৎকাল নেই। চিনি ও লবণের ইচ্ছামৃত্যু আস্তে আস্তে ভুলে যাচ্ছে আমাদের ডাকনাম। নষ্ট মালাইকারির নীচে আমাদের দারিদ্র্যে সামান্য রঙ দিচ্ছেন ভ্যান গঘ। হলদেটে একটা আগুন সরে যাচ্ছে স্মৃতিহীনতার দিকে।

 

ব্যঞ্জনের বাঁ দিক থেকে একটা যন্ত্রণার স্রোত উঠে এল আমাদের খিদেয়। মাংস ও মহাকাশের ঠিক মাঝখানে অস্তিত্বহীন একটা অধিকারবোধ তরল হতে শুরু করল। আমাদের পানপাত্র তখনো একেবারে অর্থহীন।

 

 

 

মাংসের ম্যারিনেশন আবার ব্যর্থ হল। স্মৃতিহীন ছুরি আস্তে আস্তে কেটে ফেলল তোমার অনিচ্ছা। অনিচ্ছার মশলা তৈরি করতে করতে মিথ্যে-ভ্রূণ ঘুমিয়ে পড়ল তোমার গর্ভে। অমসৃণ পাথরের ওপর দিয়ে তুমি আমার ক্ষুধার্ত মৃত্যুকে টানতে টানতে নিয়ে গেলে বহুদূর।

 

কালপুরুষের উদ্‌ভ্রান্ত কোমর থেকে এক একটা তারা খসে পড়ছিল স্মৃতিহীন রান্নায়। তীব্রভাবে পুড়ে যাওয়া সহস্রবীজ গাছ কামড়ে ধরছিল মাটি। আদিম জিভ থেকে একটা শব্দ ভিজে উঠছিল অন্তরীক্ষে।

 

তোমার জরায়ুর ফসিলে আলেক্সান্ডার ফ্রীডম্যান ব্রহ্মাণ্ডের স্ফীতির হিসেব কষছেন। অদৃশ্য এক বর্শাফলকের শব্দ আস্তে আস্তে ফুটো করে দিচ্ছে অহঙ্কার। রক্তের ভেতরে ফিসফাস করে উঠছে আরেকটা খাবার।

 

 

 

খাবারের সর্বত্র এক অনুভূতিহীন শস্যবীজ মিশে গিয়েছে। প্রাগৈতিহাসিক অস্ত্রে খন্ড খন্ড হয়ে গিয়েছে আমার শরীর। এক রজঃস্বলা দেবীমূর্তির নীচে তা লুকিয়ে রেখেছো তুমি।

 

আলোহীনতায় নীচু হয়ে তীব্র লাল মাংস আরো ছোট করে কাটছেন রামকিঙ্কর। তুমি আমার কশেরুকা চিনতে পারছো না। বোবা রান্নার ভিতরে রক্তাক্ত ফোরনাক্স, অশ্বমানব নক্ষত্রমন্ডলীর বীজ গড়িয়ে পড়ছে লক্ষ বছরের কোমল মাংসে।

 

সুসিদ্ধ মাংসের ওপর এসে দাঁড়িয়েছেন মার্লিন স্টোন। পাথর ভাঙতে ভাঙতে মৃত্যুর গল্প থেকে আমরা দুধ খাচ্ছি। দুধ ও মাংসের এই বিরুদ্ধ খাবার থেকে বিপজ্জনকভাবে ঝুলে আছে রঙ, ফাঁদ, খাঁচা, সেতু।

 

 

 

প্রাচীন মাছের ডিম হয়ে গিয়েছো তুমি। নরম কোষপ্রাচীরে কমলা আলোর ধারণা দিতে এসেছেন নন্দলাল বসু। ব্যঞ্জনের পাতলা সর ভেঙে ভেসে উঠছে একটি মাছের মাথা।

 

এক রজঃস্বলা দেবী আমায় পিচ্ছিল লিটল মার্মেডের গল্প শোনাচ্ছেন। অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠছে আমার সাঁতার, সিকতা ও বাড়বাগ্নি। ঊর্দ্ধ আকাশ ভিজে উঠছে আমাদের লোভে। ছুরিতে আঙুল কেটে যাচ্ছে। আর সেই রক্ত চেটে হিংস্র মাছ ফিরে আসছে তোমার হিমযুগের মৃত্যুগুহার রেসিপিতে।

 

মাছের শেষাংশ থেকে এক রক্তমাখা সুখ ঘুমিয়ে পড়ছে জীবনে। আমার হাত কাঁপছে। আমাদের বিস্বাদ চিৎকারের পাশে বৃত্তাকারে ঘুরে চলেছেন অসংখ্য ক্ষুধার্ত ভ্যান গখ। রাতের আলো স্থির হচ্ছে খাবারের ওপাশে।

 

 

 

 

Copyright 2020 Tanmay Dhar Published 1st Sep, 2020

image004

image005