পুনর্বিবেচনায় রবি ও ওকাম্পো

আর্যনীল মুখোপাধ্যায়

 

          বেশ কয়েক বছর আগে এক দুপুরে কাজের বিরতিতে পিটার গিৎসি (Gizzi)  ‘Hawthorne’ নামে একটা কবিতা পড়ছিলাম। পড়তে গিয়ে জানতে পারি ‘হথর্ন’ এক ধরনের গোলাপও। পিটার সেই কবিতায় বিনয় মজুমদারের দ্বিতীয়ার্ধের কবিতার মতোই অনেকটা, অভিধান থেকে শব্দার্থ সন্ধান করতে করতে কাব্যভাবনার ধারা গড়ে তুলছিলেন। কতরকমের ‘হথর্ন’, সে শব্দের কত অর্থ, কত ব্যবহার, নামশব্দ হিসেবেও তার প্রসার, বৈচিত্র্য, সব চ’লে এসেছিলো সেই কবিতায়। কিছুটা উত্তেজিতই বোধ করেছিলাম এক প্রিয়তম কবির এই প্রয়াস দেখে, যার সাথে আমার নিজের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থের ‘অর্থশাস্ত্র’ অংশের কবিতা সমান্তরাল। সেখানে এক একটা শব্দকে কবিতার কেন্দ্রে রেখে তার নানা বুৎপত্তি, ব্যবহারিক, ও ধ্বনিসদৃশ শব্দ নিয়ে কবিতাভাবনার গঠন। এসব নিয়ে আন্তর্জালে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে আরো এক অভিনব ব্যাপার ঘটলো সেদিন। বাকি অপরাহ্ন আর অফিসের কাজ হলো না।

 

          ‘হাইপারলিঙ্ক’-য়ের একটা বাংলা করা দরকার মনে হয়েছিলো সেদিন। হয়তো ইতিমধ্যেই কেউ করেছেন। সে যাইহোক, সেদিন ঘন্টাখানেকের মধ্যেই ‘হথর্ণ’ শব্দ সন্ধানে নেটে নেমে, আমি শেষ পর্যন্ত চার্লি চ্যাপলিনে গিয়ে তরী ভেড়ালাম। এই যাত্রাপথে এক যোগাযোগ থেকে আরেক সূত্রে ঘুরতে ঘুরতে লাতিন আমেরিকার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে খানিকটা সময়ও কাটিয়ে ফেলি। ভেসে আসে হোর্হে লুই বোর্হেসের নাম। সেখান থেকে তাঁর সচিব বিয়য় কাসারেসের স্ত্রী সিলভিনা ওকাম্পো হয়ে সেই কনিষ্ঠার দিদি বিক্তোরিয়া থেকে রবি ঠাকুর। বিশ্বব্রিহ্মান্ড ঘুরে টুরে এক ঘন্টার ভেতরেই আবার আপন গ্রামের সেই বটতলায়। লাতিন সাহিত্যের ইতিহাস নিয়ে সেদিন থেকেই এক নতুন কৌতূহল দানা বাঁধতে থাকে। তাকে উস্কানি দিতে থাকে নানারকমের পড়ে পাওয়া চার আনা, আর আরো চার আনা অনুজ ইস্পানি-বাঙালী কবি শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের সূত্রে। বিক্তোরিয়া ওকাম্পো সম্বন্ধেও টুকরো টুকরো বাড়তি জানা বাড়ছিলো। পরবর্তীতে কথোপকথন হতে থাকে কলোম্বিয়ান তরুণী, আমার সহকবি ক্রিস্তিনা সাঞ্চেসের সাথেও। এই সমস্তই ফিরিয়ে আনছিলো যুবা বয়সে প্রথমবার পড়া শঙ্খ ঘোষের ‘রবীন্দ্রনাথ ও বিক্তোরিয়া ওকাম্পো’র স্মৃতি।

 

          নিপুণ আকাদেমিক গবেষণার পূর্ণ চরিত্র বজায় রেখেও একটা দীর্ঘ রচনায় কীভাবে সাহিত্যগুণ আরোপ করা যায়, তাকে ভরিয়ে তোলা যায় মনোরম কাব্যিকতায়, শঙ্খবাবুর এই বই তার উদাহরণ। পরে আরো একবার পড়েছিলাম সাহিত্যরচনার কিছু মৌলিক শিক্ষা নিতে। অথচ কবি-প্রাবন্ধিক হিসেবে পরিণত হবার পথে এক সময় কিছু তৃষ্ণা ও সন্দেহও এই বইটাকে ঘিরে আস্তে আস্তে তৈরি হয়েছিলো। জিজ্ঞাসা, সংশয়, শোধন যেকোনো পাঠ বা সৃষ্টির আঁটির মধ্যে না রেখে দিতে পারলে মন ভরেনা। পড়া, শোনা বা লেখাকে ঠুনকো লাগে। এইটে আমার দেরিদিয় শিক্ষার্জন। শঙ্খবাবুর বই স্বাভাবিকভাবেই রবীন্দ্রজীবনে বিক্তোরিয়ার প্রভাব, প্রেম, পূজা ও আশ্রয়কে ঘিরে। রবির জীবনে বিজয়া কখন, কেন, কীভাবে, কোথায় উপস্থাপিত হলেন, কখনো সোচ্চারে, কখনোবা সঙ্গোপনে, সেইদিকটা জানতে পেরেছিলাম। যেটা পারিনি, যার তৃষ্ণা বাড়ছিলো, সেটা লাতিন পরিপ্রেক্ষিতে এই সম্পর্ক ও বিক্তোরিরার জীবন সম্বন্ধে। এরই মধ্যে একদিন YouTube য়ে একটা আলগা ভিডিও পাই যেখানে এক মার্কিনি বাঙালী পুজোতে এক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রেমী কবি-লেখকের সাক্ষাতকার নিচ্ছে। সেই আলগা সাক্ষাতকারে এক সময় সুনীলবাবু ছেলেটিকে বললেন – ‘রবীন্দ্রনাথের কবিতা স্প্যানিশ ভাষায় কতটুকু অনুবাদ হয়েছে? … ভিক্তোরিয়া ওকাম্পো ভালো ইংরেজি জানতেন না’।     

 

         ঠিক এইখানতায় এসে যেমন ঠোক্কর খাই, সাথে সাথে আমার সন্দেহের জায়গাটা আবার ঘনীভূত হতে থাকে। সুনীলবাবুর বৃহৎ ও বিশদ আন্তর্জাতিক যোগাযোগের কথা সকলেই জানেন। অতীতে অনেকবার এসব নিয়ে ওঁর সাথে অনেক কথা হয়েছে। ওকাম্পোর সাথে রবির সম্পর্কের রোমান্টিকতা অনস্বীকার্য হলেও একটা ইংরেজি অনুবাদহীন ইস্পানি বই লোক-মারফত পড়ে শঙ্খবাবু ওঁদের সম্পর্কের সাহিত্যিক অভিভাবের অতটা কীভাবে উন্মোচন করলেন সেই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে এসেছে। ওকাম্পো যেমন সুনীলবাবুর ভাষায় ‘ভালো ইংরেজি’ জানতেন না, শঙ্খবাবুও, যতদূর জানি একেবারেই ইস্পানি জানতেন না। তবে রবি ও বিজয়ার মধ্যে যে সেতু গড়ে ওঠে ১৯২৪ সালে বুয়েনোস আইরেসের … তার ভিত কি তবে প্রায় নির্ভাষ, দোভাষী সংলগ্ন দেয়া নেয়ায়? ওকাম্পো ছিলেন এক বনেদী পরিবারের মেয়ে জানি, আর্খেন্তিনার সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে ভরকেন্দ্রে। তবে কি শুধু লোকমুখের কবিখ্যাতি আর দীর্ঘাঙ্গী, সন্ত চেহারার ‘যোগী’টির প্রতি ভিন্‌-সাংস্কৃতিক টান? যা, বহু ধনী, শ্বেতাঙ্গিনী উচ্চবর্গীদের সে যুগে ছিলো?   

 

অনুসন্ধিৎসার মুখে এক ছটাক নুন দিয়ে দেয় ক্রিস্তিনা অবিলম্বে। সুনীলের বক্তব্য শুনেই তার বিস্ময়, ‘ওকাম্পো ভালো ইংরেজি জানতেন না! সে কি! উনি তিনটে ভাষায় ফ্লুয়েন্ট ছিলেন, এবং আজীবন’। এরপর ক্রিস্তিনা নানা গবেষণাসম্পদ ভাগ করে নিতে শুরু করে। বিভিন্ন বই যার কিছু ফিরে পড়ি, কাগজের খবর, ইউটিউব সাক্ষাতকার ইত্যাদি। বেশিরভাগ তথ্যসম্পদই ইস্পানি ভাষায়, যা সে আলগা অনুবাদ করে দিতে থাকে। গত ক’বছরে আমিও একটু ঠেকা দেবার মতো ইস্পানি শিখছি। সবটা না হলেও সাদামাটা তথ্যটা পড়ে বুঝতে পারি। আস্তে আস্তে এত বছরের তেষ্টা মিটে যেতে থাকলো।

 

যৌবনে বিক্তোরিয়া ওকাম্পো

 

১৯২৪ সালে সান ইসিদ্রোয় রবির সাথে বিক্তোরিয়ার সাক্ষাতকারের অন্তত এক দশক আগে ‘গীতাঞ্জলি’ পড়েন ওকাম্পো। পড়েন প্রথমে ফরাসী অনুবাদ ‘শাঁসঁ দ্যফরাঁস’, পরে ইংরেজিতে কবিকৃত ‘Song Offering’। এছাড়াও ওকাম্পো যে রবীন্দ্রনাথের ইংরেজিতে অনুবাদ হওয়া আরো লেখা ও পরবর্তীকালে তাঁর কবিতা নিয়ে ইউরোপীয় ও মার্কিন কবি, অধ্যাপকদের আলোচনা পড়েছিলেন তার প্রমাণ ওঁর অনেক লেখায়। ২৪ সালের সেই সাক্ষাতকারের পর আর্খেন্তিনার প্রখ্যাত ‘লা নাসিওন’ পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লেখেন ও তার পরবর্তীতে চটি বই ‘Tagore en las Barrancas de San Isidro’ (সান ইসিদ্রোর গিরি উপত্যকায় তাগোর’)। সম্ভবত, এই বইটাই শঙ্খ পেয়েছিলেন আয়ওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে।

 

অতি সংক্ষিপ্ত পুর্নচর্চায় মনে করিয়ে দিই বিক্তোরিয়া ওকাম্পো আর্খেন্তিনার বুয়েনোস আইরেসের এক বনেদী, ও সম্ব্রান্ত পরিবারে জন্মেছিলেন ১৮৯০ সালে। বাবা ছিলেন নামী স্থপতি।  বুয়েনোস আইরেসের দুই অভিজাত পাড়ায় তাঁর দুটো প্রাসাদোপম অট্টালিকা – সান ইসিদ্রোর বিযা ওকাম্পো যেখানে রবি আমন্ত্রিত হয়েছিলেন, আর পালের্মো চিকোতে অন্য অট্টালিকা।

 

সান ইসিদ্রোর বিযা ওকাম্পো বাসভবন ২০১৩ সালে

 

 

বাবার কিছু গোঁড়ামি থাকলেও শিক্ষা, সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সেনিওর ওকাম্পো মেয়েদের মুক্ত রেখেছিলেন। বিক্তোরিয়া এদের মধ্যে ছিলেন তীব্র প্রগতিশীল। তিনি অল্পবয়স থেকেই সিগারেট খেতেন, প্যান্ট পরতেন, গাড়ি চালাতেন, স্বচ্ছন্দে পুরুষসঙ্গ করতেন যা বিশ শতকের প্রথম দু-দশকে আর্খেন্তিনায় বিরল ছিলো। অনেকেই জানেননা আর্খেন্তিনায় তিনিই প্রথম মহিলা যিনি ড্রাইভিং লাইসেন্স পান। পরবর্তীকালে পোশাক-আশাক, চশমা, পার্স, ছাতা, ইত্যাদির ফ্যাশনেও তাঁর প্রগতিচিহ্ন, স্পষ্ট, সাহসী মনোভাব ধরা পড়তো। কিন্তু বিক্তোরিয়ায় বৃহত্তম খিদে ছিলো বই। পড়তেন অজস্র, অসংখ্য বই। নিচের ভিডিওতে বিযা ওকাম্পোর গ্রন্থাগার, যা ‘মাতেরিয়া প্রিমা’ প্রোগ্রামের অন্তর্গত, তার প্রধান পরিচালক বলছেন সেখানে ১১,০০০ বই ও ৪০০০ পত্রপত্রিকা রয়েছে ইস্পানি, ইংরেজি ও ফরাসী ভাষায়। কাজেই সুনীলের বক্তব্য এই পাহাড় প্রমাণের কাছে একেবারেই টিকছেনা। রবীন্দ্রনাথের কবিতা অন্তত দুটো ভাষাতে ভালোভাবে পড়েই ওকাম্পো তাঁর সম্বন্ধে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

 

           এমন সুবিশাল এক পুস্তককীট,  অথচ রবীন্দ্রনাথের মতই বিক্তোরিয়া ওকাম্পো সাবেকী, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাননি। কোনো ইস্কুল-কলেজে যাননি কোনোদিন। পড়াশোনা চলতো পিসী বিওলেতার কাছে। তাঁরা ছয় বোন, যাদের প্রথমা বিক্তোরিয়া আর কনিষ্ঠা সিলভিনা, শিখতেন ইংরেজি, ইস্পানি, ফরাসী, সাহিত্য, সঙ্গীত, ধর্ম, ইতিহাস ও গণিত। যৌবনেই বিক্তোরিয়া লাতিন সাহিত্যের বিদুষী হয়ে উঠেছিলেন দক্ষিণ আমেরিকায় যেমনটা, উত্তরে ছিলেন গের্ট্রুড স্টাইন – আমেরিকা ও ইউরোপে। স্টাইনের ছিলো ‘সালোঁ’, আর বিক্তোরিয়ার সান ইসিদ্রোর বিযা ওকাম্পো ও মার-দে প্লাতার বাড়ি। সেখানে ইউরোপ, উতর ও লাতিন আমেরিকার প্রায় সমস্ত কিংবদন্তী কবি-শিল্পী-লেখক হাজিরা দিয়েছেন নিয়মিত। বিজ্ঞানের মানুষেরাও কখনো কেউ কেউ, যেমন ফ্রয়েড। দীর্ঘ দূরান্ত থেকে একমাত্র রবি।

          ১৯৩১ সালে ‘সুর’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেন। সেই কালোত্তীর্ণ পত্রিকায় আন্তর্জাতিক সাহিত্যের প্রায় সমস্ত শীর্ষস্থানীয়েরা লিখেছেন কয়েক দশক ধরে – অক্তাবিও পাস, হোর্হে লুই বোর্হেস, টি এস এলিয়ট, আলবেয়ার কামু, কার্ল ইউঙ, সিগমন্ড ফ্রয়েড, ভার্জিনিয়া ঊলফ, হেনরি মিলার, গ্রাহাম গ্রীন, ঝাক লাকাঁ (শেষোক্ত দুজন তাঁদের বই উৎসর্গ করেছেন বিক্তোরিয়াকে) – দীর্ঘ, নির্যতি সেই তালিকা। উনিই ‘সুর’ প্রকাশনী থেকে বের করেন লোরকার প্রথমদিকের বই – ‘এল রোমান্সেরো গিতানো’। এই প্রকাশনী থেকেই রবিকে নিয়ে লেখা বিক্তোরিয়ার চটি বইটা। এ হেন প্রগতীশীলা যে ফ্যাসীবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবেন বলাই বাহুল্য। আর্খেন্তিনার হুয়ান পেরন সরকারের তীব্র সমালোচক ছিলেন ওকাম্পো। পথে নামেন একাধিকবার, সূচীমুখ লেখালিখি অব্যাহত, ফলে সরকার জেলবন্দী করেন ওঁকে। তখন তাঁর ৬৩ বছর বয়স। বহু বিশ্ববন্দিত ব্যক্তিত্বরা পেরন সরকারের সমালোচনা করেন তখন, ওকাম্পোকে মুক্তি দেবার আবেদন করতে থাকেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন জহরলাল নেহরুও।

          এই গবেষণার মাঝে এবছর ফেব্রুয়ারি মাসে একদিন ক্রিস্তিনা হঠাৎ জানায় আর্খেন্তিনার প্রধান সংবাদপত্র ‘লা নাসিওন’-য়ে ওকাম্পো ও রবিকে নিয়ে এক নতুন আলোচনার কথা। একটি ছোট নিবন্ধ যা নিচে দেওয়া রইলো মূল ইস্পানি ভাষায় - 

https://www.lanacion.com.ar/opinion/victoria-ocampo-y-tagore-almas-en-pugna-parte-ite-dit-il-vendiat-adignibh-parte-i-nid2332162

নিবন্ধে এক জায়গায় বলা আছে ওকাম্পো পরিবার তাদের সান ইসিদ্রোর বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের আতিথ্য মেনে নিতে পারেননি, বিক্তোরিয়া তাঁদের বোঝান ও নিজের একটা টায়রা বিক্রি করে কবির আতিথেয়তার খরচ তোলেন।  আরো এক জায়গায় আছে এই কটা বাক্য -

‘La obra es una fuente inagotable de informaci๓n valiosํsima sobre la sensibilidad intelectual (valga el oxํmoron) de toda una ้poca y, especialmente, muy importante para entender qui้n era Victoria, qu้ fuegos la impulsaron a convertirse en una figura fundamental de la cultura en la Argentina del siglo XX. Pero, sobre todo, narra la historia de una sublime devoci๓n espiritual entrampada en una red de fuertes pasiones carnales. Hoy y ma๑ana, en esta pแgina, pinceladas de esas almas en pugna’

আলগা অনুবাদে বলা যায় এখানে কেতকী কুশারী ডাইসনের ওকাম্পো ও রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে বইয়ের কথা রয়েছে। এই প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘এই কাজ (ডাইসনের) একটা গোটা যুগের বৌদ্ধিক সংবেদনশীলতা সম্বন্ধে মূল্যবান তথ্যের এক অদম্য উত্স, যা বিশেষত, বিক্তোরিয়া কে ছিলেন তা বুঝতে সাহায্য করে, এবং কী কারণে, কোন অগ্নিসংযোগ তাকে বিশশতকের আর্খেন্তিনিয় সংস্কৃতির এক মৌলিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল। সর্বোপরি, এই বই দৃপ্ত শারীরিক আবেগের জগতজালে ডুবে থাকা এক দুর্দান্ত আধ্যাত্মিক ভক্তির গল্প বলে’। 

          পাশাপাশি আরো এক সাংঘাতিক উপাখ্যান আমার এই খনন থেকে বেরিয়ে আসে। জানতে পারি পাবলো সেসার নামে এক আর্খেন্তিনিয় চিত্র পরিচালক সম্প্রতি এক সত্য কাহিনির সন্ধান পান। এক হিংসাত্মক নাবালক ক্রোধান্ধ হয়ে তার বাবা-মাকে খুন ক’রে পালাবার পথে ধরা পড়ে। নাবালক অপরাধীদের জেলের গ্রন্থাগারে সে একদিন একটা বই পায়। বইটা শান্তিনিকেতনে রাবীন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা সম্বন্ধে। এই ‘প্রকৃতিস্থ’ শিক্ষাব্যবস্থা তাকে টানে দুর্মরভাবে। সে রবিকে নিয়ে লেখা ওকাম্পোর বইটাও পায় ও গোগ্রাসে পড়ে ফেলে। জেলে কাজ করে সে ভারত যাত্রার টাকা জমায়। তারপর মুক্তি পেলে সে শান্তিনিকেতন যাবার মরণপণ ক’রে বসে। এদিকে তার কোনো পাসপোর্ট নেই, পাবার সম্ভাবনাও নেই। সেই দুঃখে ছেলেটি সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে প’ড়ে আত্মহত্যা করে। এই কাহিনির পটভূমিকায় আসে বিক্তোরিয়া ও রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাতের গল্প। পাবলো সেসারের ছবিটার নাম Thinking of Him - ২০১৭ সালে প্রকাশ পায়। ‘মামি’ চলচ্চিত্র উৎসবেও দেখানো হয়েছে। সেখানে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ভিক্টর ব্যানার্জি, ওকাম্পোর ভূমিকায় এলিওনোরা ওয়েক্সলার। ছবিটার এক খন্ড তুলে দিলাম নিচে –

 

          দীর্ঘ জীবন ছিলো বিক্তোরিয়া ওকাম্পোর। কিন্তু শেষের বছরগুলোয় মুখের ক্যান্সার নিয়ে খুব ভুগেছিলেন। ১৯৭৯ সালে ৮৯ বছর বয়সে যখন মারা যান, বোর্হেস লিখেছিলেন -  ‘একটা দেশে ও সময়ে যেখানে মেয়েদের  হয়ে থাকতে হতো সাধারণ, বিক্তোরিয়া ছিলেন স্বতন্ত্র, অসাধারণ। নিজের যাবতীয় প্রতিভা ও অর্জন তিনি এই দেশ ও মহাদেশের জন্য রেখে গেছেন। ব্যক্তিগত পর্যায়ে তাঁর মৃত্যু আমার কাছে অপ্রতিম ক্ষতি, কিন্তু একজন সাধারণ আর্খেন্তিনিয় হিসেবে তার কাছে আমার ঋণ অনেক বেশি’। ১৫ই মে ১৯৭৯ সালে বোর্হেস লাতিন সাহিত্যে ওকাম্পোর ভূমিকা নিয়ে এক বক্তব্য রাখেন যা ধরা রয়েছে নিচের ভিডিও-অংশে। সেখানে রবীন্দ্রনাথের কথা প্রসঙ্গে বোর্হেস বলছেন, ‘বিক্তোরিয়া যেমন ইউরোপের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য অনুভব করেছিলেন, তেমনি করেছিলেন তাগোরের মাধ্যমে, তাঁর দর্শনের মাধ্যমে, ভারত তথা পূর্বের’। 

 

বুয়েনোস আইরেসের ‘রেকোলেতা’ গোরস্থানে শায়িতা বিক্তোরিয়া ওকাম্পো। আর রবীন্দ্রনাথের একটা আবক্ষমূর্তি রয়েছে সে শহরের ‘কবিদের বাগান’য়ে।             

 

                                               ====        

     

আমি একবিন্দু একবিন্দু মধু নিয়েছি

তোদের কিছু গন্ধ কিছু গন্ধ ধার নিয়েছি

                                                  

। ঙ্ক্রিস্তিনা সাঞ্চেস লোপেসের সাথে কথোপকথন, ফেব্রুয়ারী,২০২০।

 

Jorge Luis Borges : Homenaje a Victoria Ocampo, Discurso.Jorge Luis Borges : Homenaje a Victoria Ocampo, Discurso. https://youtu.be/eQQNhAxYgjg1977

 

৩। ‘Victoria Ocampo y Tagore. almas en pugna (Parte 1)’, La Nacion, Argentina, Feb 10, 2020. 

 

Doris Meyer, “Victoria Ocampo: Against the Wind and the Tide”, New York : G. Braziller, 1979.

 

Amy K. Kaminsky, Argentina: Stories for a Nation, Univ Of Minnesota Press, 2008.

 

Alfonso R. Chacon R, The Forgotten Stone: On Rabindranath Tagore and Latin America , পরবাস, ২০০০

https://www.parabaas.com/SHEET3/LEKHA16/forgotten.html

 

৭। Ketaki Kushari Dyson, On the Trail of Rabindranath Tagore and Victoria Ocampo, পরবাস, https://www.parabaas.com/rabindranath/articles/pKetaki1.html, 2001.

 

৮। Mistral, Gabriela. "Glosas a la inquietud del jardinero". Seleccion deobras. By Rabindranaz Tagore. Ed. Raul Ramirez. Santiago.

 

৯। Paz, Octavio. "Los manuscritos de Rabindranath Tagore". El signo y el garabato. Mexico, DF: Ed. Joaquin Mortiz. 1975.

 

১০। Tagore, Rabindranaz. Obra escojida. Trans. Zenobia Camprubi de Jimenez. Madrid: Aguilar. 1978.

 

১১। Tagore, Rabindranaz. Seleccion de obras. Ed. Raul Ramirez. Santiago.

 

১২। Ketaki Kushari Dyson, ‘In Your Blossoming Flower-Garden ; Rabindranath Tagore and Victoria Ocampo’, Sahitya Academy, India, 1996.

 

 

বিশেষ কৃতজ্ঞতাঃ সায়ন কুমার দে ও শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। সায়ন শঙ্খ ঘোষের বইটির কিছু অংশের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে। শুভ্রর সাথে এই লেখা গড়ে ওঠার সময় লাতিন সাহিত্য নিয়ে নিরন্তর কথাবার্তা হয়।    

                                   

Copyright ฉ 2020       Aryanil Mukhopadhyay                Published 1st April, 2020.