শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা

 

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৭৮, কলকাতা। প্রকাশিত কবিতার বই ৪টি। বৌদ্ধলেখমালা ও অন্যান্য শ্রমণ কাব্যগ্রন্থের জন্য ভারতের জাতীয় সাহিত্য আকাদেমির যুব পুরস্কার পেয়েছেন। স্পেনে পেয়েছেন আন্তোনিও মাচাদো কবিতাবৃত্তি, পোয়েতাস দে ওত্রোস মুন্দোস সম্মাননা। স্পেনে তিনটি কবিতার বই প্রকাশ পেয়েছে। ডাক পেয়েছেন মেদেইয়িন আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব ও এক্সপোয়েসিয়া, জয়পুর সাহিত্য উৎসব সহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক উৎসবে। ভারতের স্বাধীনতার ৭০ বছর উপলক্ষ্যে আয়োজিত Poetry Connecyions India-Wales এ কবিতা রেসিডেন্সিতে ডাক পেয়েছেন। কৌরব অনলাইনের সঙ্গে যুক্ত। পেশায় স্পেন সরকারের ভাষাশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইন্সতিতুতো সেরবান্তেস, নয়াদিল্লিতে স্পেনীয় ভাষার সহকারী অধ্যাপক।

চিত্রস্বত্বঃ পাবলো লোপেস

 

 

অসাড়লিপি ২

 

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

 

 

অসাড় একধরণের গহ্বর

জিভের মধ্যে সেঁধিয়ে থাকা এঁটেল মাটি

একধরণের অন্ধত্ব, মডেল হৃৎপিণ্ড

জালিকাকার ফুসফুস

সমস্ত রকমের চলাচলের ঊর্ধ্বে

অসাড় একধরণের রক্ত ও তাকে বহন করা উচ্চকিত সুড়ঙ্গ

খাদ্য ও খাদক

অন্ত্র ও তার অসুখ

একধরণের ধনুষ্টঙ্কার

স্পষ্ট বেঁকে যাওয়া

দুটি পেশি থেকে ছিটকে আসা গতি

যাকে তোতলামি বলে জানি

 

এখানে দিন আর তেমন অস্পষ্ট নয় কেবল না কথা বলা মানুষের ভিড়ে জলফোসকার মত থেঁতলে যাচ্ছে নৈঃশব্দ্য আর আমাদের এতদিন চিৎকারে পরিণত না হওয়া কণ্ঠস্বর ফেঁসে থাকছে পাতলা কাপড়ে যেন এই সময় এক শিকার ধরতে ভুলে যাওয়া কুকুর নিবিড় ঘুম ভেঙে উঠে ইতস্ততঃ ঘুরে বেড়াচ্ছে, এখন অসাড় নেই, আমাদের সর্বস্ব জুড়ে পড়ে আছে বালির পরিত্যক্ত সমুদ্র বিলাপ, এভাবেই তৈরি হচ্ছে পূর্বাপরহীন কিছু পাখি যারা রাতের বিভা থেকে স্তন্য পান করে।

 

এরোপ্লেন থেকে দেখলে রুখা পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে নদী

কোনও অংশের জল ঝলসে গেছে

অথবা জমাট রাংতা

খুব নিচে নেমে গেলে পাপারের অসম্ভবতা বোঝা যায়

 

এভাবেই অক্টোবর ও তার দ্রুত ফুরিয়ে আসা ধর্মীয় অছিলা কোনও বিরাট মন্দির বা কপালে চওড়া বিভূতি ও চন্দন লাগানো সন্ন্যাসী নয় বরং এক খোলামেলা বিসর্জন শেষের প্যান্ডেল ছোট শহর এক গানের বদ্ধ বাক্স জিভ ও অস্থিরতা জুড়ে থাকছে শুধু নারকোলের মিষ্টির স্বাদ ও পুরনো রাস্তার প্রতি বাষ্পশ্বাস এখানেই অসাড় লুকিয়ে আঁচড়ে কেটে রাখছে রাস্তা

 

আমি এভাবেই টের পাই স্পষ্ট পুরনো সভ্যতা আসলে অহং মাত্র অস্বীকারের গায়ে টাঙিয়ে রাখা ধ্যাবড়া রং অক্ষরশূন্য আমরা সংকুচিত একটুকরো রুটির মলিনে

 

অথচ আমরা জানতাম কীভাবে বারবার সম্পর্কের কাছে নেমে আসা মাথা থেঁতলে যায় সিদ্ধান্তহীনতায়, জানতাম কীভাবে অসাড় মাকড়সার পদক্ষেপে ঘেঁটে দেবে ঝরাপাতা ও শান্ত জলে ডুবে থাকা চালতা ফুলের ঘোরে ভরে থাকা ঘুম কিছু লোক দেখতে পায় অ্যালুমিনিয়ামের চাকতি থেকে বেরোন আলো চৈত্র ও তার পবন সমেত কেউ জঙ্গলের দিকে গেছে; তারা ফিরল কিনা স্পষ্ট নয় শুধু গুলিয়ে যেতে থাকে স্বপ্নে দেখা টগর ও নদীখাতের শুষ্কতা

 

আকস্মিক আবিষ্কার করে নেওয়া বহুতলরাশির মাঝখানে অখ্যাত প্রাচীন দরগা কি আমাদের কিছু বলতে চাইছে? পীরের নাম বা পড়তে না পারা ফার্সি অক্ষর? এখানেই অসাড় নির্মিত উৎসব, রোশনাই পাকানো শিরা,

চারপাশে শুধু ঠাণ্ডা বিলাপ,

রঙিন জলজ প্রাণী,

স্থির ও প্রাচীন

কিছুতেই যাদের সূর্যের কৌতুহলের সামনে পড়তে হবে না

 

এই যে মারাত্মক হিংসা লুকিয়ে রাখা, পরপর শুধু আক্রমণ শানিয়ে তোলা সকাল থেকে, শুকনো মাটিতে বারবার আঁচড়, সাম্রাজ্য অথবা ধুলো একসঙ্গে এগোন, দুপুর নামক এক আগুনের মিনারের দিকে কেউ এখানে সেই ছায়ার কুয়ো খোঁজার কথা বলে গেছে, যেখানে তার সর্বস্ব ডুবেছে

 

আমি শুধু চারপাশে পুরুষ দেখছি, কোনও বন্দুকের ছায়া আমার কাঁধে লেগে নেই তবু আমি ঘসে তাকে তুলতে চাইছি, এক তীব্র নারীহীনতা ব্যাপ্ত হয়ে আছে এই দেখাগুলোয়, যেভাবে মরুদেশে দুপুরের আকাশের রঙে একটা ছাইভাব থাকে

 

এইখানেই অসাড় অপেক্ষা করে নৈঃশব্দ্য একধরণের পুরনো গাছের ঝুরি শিশুরাতে মায়ের চুড়ির শব্দে ভেঙে যাওয়া ঘুমের মত পুনরায় নিশ্চিন্ত হয় থেঁতলে যাওয়া মাথাগুলোর হিসেব থাকে না, অসাড় ধীর থাবায় বালি আঁচড়ায়

 

হাঃ এই দেশ ও তার ধমনীবিন্যাস!

সহস্র দাম্পত্য ও তার অভ্যাসের সন্তান

ভরে উঠছে শরীরে ছড়িয়ে থাকা অজস্র বীজ

এই বিরক্তি, ঠেসে রাখা কেঁচো গন্ধের মাটি

আমি বহন করছি মুখে

 

স্পষ্ট এগোই, হাত পা কাঁপে, এই কোলাহলের দেশে পায়ে লুটোয় শব্দ ও তীব্রতা বলার বা শোনার নয় শুধু দৃশ্য বড় হয়ে ওঠে, গিলে নেয় যাবতীয় অভিঘাত, আমার প্রত্যাঘাত ক্ষমতা; অন্ন-বস্ত্র সম্ভাবনা দৃশ্যের চকচকে কাপড় হুমড়ি খেয়ে নেমে যায়, আচমকা হোঁচটে পতিত শিশুর সামনের মাঠের মত, শুকনো ঘাসের গন্ধের মাঝে উঠে দাঁড়াবার অছিলা দরকার নেই তবু দাঁড়াতে ইচ্ছে করে না। যেভাবে চারপাশ থেকে প্রতিনিয়ত পিঁপড়ের মত বেরিয়ে আসা বেঢপ চেহারার কালো মেয়েদের জিজ্ঞেস করলে জানতে পারি তাদের পছন্দের কোনও ভাগ নেই; যেভাবে তারা ঘর মোছা বা বাসন মাজাকে চিহ্নিত করে ভাল লাগা হিসেবে

 

আর এইখানে বসেই আবিষ্কার করে নেওয়া যাবে মুখ, আহত বা অপমানিত, ঝড়ে বা উন্নয়নে হারিয়ে যাওয়া, বিক্রি করে দেওয়া আত্মীয়ের মুখ, তাকে সহজেই ধরে ফেলা যাবে, জবরদখল করা যাবে, মেরেও ফেলা যাবে কোনও কৈফেয়ত না দিয়ে

 

এখানে অসাড় এসে আলতো হাত রাখবে আমাদের মাথায়, ছায়ার মত এক উপস্থিতি আমাদের ভুলিয়ে রাখবে এই তালগোল পাকানো যন্ত্রের শরীরে যাকে শহর বলে ডেকেছি; এক নাছোড় বদান্যতা যায় দুঃশব্দে ঘুম ভেঙে উঠে বেরিয়ে পড়েছি প্রতিদিনের মত, বয়ে চলেছে, সরীসৃপের চলনে, শামুকের চলনে, মাকড়শার চলনে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে এক সমাহিত হত্যালীলার দিকে, আমরা হয়ত কেউ কেউ বলতে চাইছে এভাবে নয়, অথচ সে আঁকড়ে আছে আমাদের প্রতিরোধহীনতা, আমাদের বহুদিন উচ্ছ্বাস না দেখা চোখ যে আরাম চেয়েছে তাই তো আছে তার কাছে... কথা নয় শুধু দৃশ্য ও তার দিগন্তব্যাপী মোহ, শুধু অসাড় ও তার সীমানা উজাড় করা স্থিরতা...

 

Copyright 2020 Subhro Bandopadhyay Published 1st Apr, 2020.

 

gadha-transparent