সব্যসাচী সান্যালের কবিতা

সব্যসাচী সান্যাল স্বয়ংক্রিয়ভাবে লিখে চলেছেন একের পর এক সুদীর্ঘ মাস্টারপিস যদিও ইদানীং কিছুটা বিশ্রান্ত। সব্যসাচী যে কবিতা লিখছেন আজ এক দশক জুড়ে, সেরকম নমুনা বাংলা সাহিত্যের অন্য কোনো নদীকূল বা গিরিখাত থেকে এনে দেওয়া সম্ভব না। যাঁরা খাদে নেমে অভ্র ও তামা খুঁজে না পেয়ে কবিতার সেই সূত্রভাবনাকে সম্পূর্ণ ‘গ্যাস দেওয়া’ ভেবে বাড়িমুখো হলেন, সব্যসাচী সেই একই খাদে নেমে দেখিয়ে দেন – কবিতা কী জিনিস!  একাধিক অসমান্তরাল কাব্যগ্রন্থ। শেষ বই কালো পাথরের বাড়ি 







 

 

সব্যসাচী সান্যাল

 

কাঠের পুতুল

 

পুতুল ঘুমিয়ে আছে ভোরবেলা
ওকে তুমি দাঁত দিয়ে জাগাও

-          স্বদেশ সেন

 

পুতুল তো ভাষা, যে ভাষা সশব্দে
দরজা আবজে দেয় মুখের ভেতর
হারিয়ে রয়েছ, পোড়োবাড়ি, নুনের খিলান
পুতুলের স্মৃতির ভেতর শুধু একগজ খেলা করে হাত

 

জানি না কেমন করে—তোমাকে বোঝাবো
ফুলদানি থেকে নেমে বাগানে এসেছি
পূর্বাভাসের মত আখরেরা ওড়ে...
দাঁতের ফোকরে পাখিগুলো ওড়ে...
এটুকুই বাসযোগ্য, এটুকুই লেখালিখি অচেনা ভাষায়...

পুতুলের স্তনের খাঁজটুকুই আলো
আর সে’ই স্তব্ধতা, যাকে ফুঁপিয়ে ওঠার
দিন দেখা যায় বড়জোর দু’এক লহমা
ওটুকুই লেখালিখি, শূন্যতা, গতরখায়েশ
কী করে ভাবলে আমি ভাষাকেও অনুমতি দেব,
বাজিয়ে তোলার মত সর্বনাম দেব শীতের বিকেলে...

 

পুতুল কোথায় থাকে? পুতুলের কোনো দুঃখ নেই?
                                   - স্বদেশ সেন

 

পুতুল এসেছে আজ আমার বাড়িতে
বিছানায়, চায়ের টেবিলে—আমি
তার মানডেন ক্রাইসিসগুলি ধৈর্য ধরে শুনি
তার আঙ্গুল-প্রমাণ জুতোয় পা ভ’রে
মতামত দিই। রুমাল এগিয়ে দিই-- তার কাঠের
অশ্রু, তার তামার অশ্রু, তার আইভরি কোঁদা জল...
আমার গোড়ালি ফোস্কায় ভরে যায়...
পুতুল আমায় তার কবিতাও শুনিয়েছে কিছু
পরামর্শ চেয়েছে...

আমি জানি কালকে পুতুল, অন্য এক ‘আমার’ বাড়িতে
বিছানায়, চায়ের টেবিলে— পুরোনো ‘আমাকে’
 
নিয়ে তার ক্রাইসিস গুছিয়ে বলবে—অন্য এক আমি
তার আঙ্গুল-প্রমাণ জুতোয় সেঁধিয়ে পা মতামত দেব
নতুন ফোস্কায় ভরে যাবে গোড়ালি আঙুল

পুতুল কোথায় থাকে? পুতুলের কোনো দুঃখ নেই।

 

পুতুল তোমার শেষ যে না পাই
প্রহর হল শেষ—

-          রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

প্রহর শেষ হল আর আমি বৃষ্টির
ফাঁকে অসম্ভবকে দেখতে পাচ্ছি
সে ভিজতে ভিজতে গাড়িতে পেট্রোল
ভরে নিচ্ছে, এরপর লং জার্নি এর পর
তার না থাকা ভেজা বাতাসের মধ্যে মৃদু একটা
আকার হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে, প্রহর হল শেষ
অথচ কেউ গান গাইছে, গানের জামা নীল
গানের প্যান্টি কালো, গান তার বুক আমার
 
উদলা পিঠে...আমি আর গান দুজনেই উত্তেজনা
 
পার করে এসে, শুধু স্পর্শ, শুধু স্পর্শ, চেয়ে
 
আছি জানলার বাইরে, ওখানে পুতুলের বাড়ি
ওর অনন্তবাগান, ঘাটশিলা, অগাধপিয়ানো...

পুতুলের হাতখানি দেখে যাও
পুতুলের রান্নাঘরে সোনালি বৌলে
জেগে ওঠে মাছ। পুতুলই কেটেছে তাকে
আঁশের বাইরে এনে কবিতা করেছে।
 
ক্ষতখানি দেখে যাও যার জন্য
 
পুতুল বুনেছে আজ নতুন আঘাত

 

তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও—আমি এই পুতুলের পাশে
রয়ে যাব; দেখিব কাঁঠালপাতা ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে
                                      -জীবনানন্দ দাশ

 

পুতুলের যোনির ভেতর ঘুম যায় পুতুলশিকারি
শিথানে পোখরাজ, অভ্রের খনি
রাত হলে নামে নীল শিখা,
 
আকাশে শিকারি জেগে ওঠে

নিঃশ্বাসের ইকোগুলি নিঃশ্বাসের আয়োজনে লাগে, 
সারাদিন বন্ধ ঐ লাল দরোয়াজা—যোনীর বাইরে থেকে
ক্রমাগত ডেকে গেছি—পুতুল! পুতুল!
 
স্বস্তি এসে জল হয়ে আছে পুতুলের অ্যালকালি চোখে

শূন্যতা থেকে ফিরে তুমি যা-যা দেখ
যা কিছু দৃশ্য, সব তোমার ভেতর
যে ডাকে দিচ্ছ সাড়া, সে ডাকও তোমার
গলার ভেতর থেকে পুতুল বলেছে...

পংক্তি বেছে সাড়া দিতে পার। দু’লাইনের ফাঁকে
 
ঢুকতে যেও না। ওখানে পুতুল থাকে, পুতুলের
সাড়াশব্দ থাকে...


তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও—আমি এই কবিতার পারে
রয়ে যাব; দেখিব কাঁঠালপাতা ঝরিতেছে খাদের কিনারে

 

 ‘i’m going to hide behind language

and why is that

i’m afraid’

                   --Alejandra Pizarnik

 

সে চোরাগোপ্তা ঢুকে পড়ে আমার লেখায়

তার কাঠের কিডনি তার কাঠের লিভার

তার কাঠের ধমনী ধরে ছুটে চলা কাঠের রক্ত

রাত মাপে, নিয়ন্ত্রণ, দেশকাল, ধর্ম, জানাজা, ধ্বজা

সারাদিন শুধু মেপে চলে...

অথচ আমি তো তাকে সালোয়ারে দেখতে চেয়েছি

টেবিলের ওপর বিছানায় বাথটাবে জানালা বাগানে

দড়ি খুলে প্রবেশ চেয়েছি কাঠের হৃদয়ে

 

কাচের কফিন, আর ঘোড়ার শকট

আর যারা শবানুগামী সূর্যাস্তের দিকে মৃদু হেঁটে যাওয়া

আবেস্তা, ধুনো, গুলগুল, কালো মলাটের নিচে

ফুঁপিয়ে ওঠা একফর্মা কবিতার বই...তার কালো লিপস্টিক

 

শেষ পর্যন্ত জিভের ওপর টুপ করে খসে পড়বে

সে’টুকুই জল, বাকীটা জলের মত, অন্য কিছু

অন্য কারো মদ, সায়ার দড়ির ভাঁজে নম্র মাখন

আমি তো অতিথি শুধু, মাঝে মাঝে শরীরে বেড়াতে

আসি, মেঘ ও রৌদ্র দেখি, লতাগুল্ম, গুটিপোকা, সোনার কোকুন

‘মানুষ তো একজন, তার কতদিকে মন যায়’

 

কতদিকে নীরব লেগেছে-- ডালে, মেঘে, ছত্রছায়ায়

উপদ্রুত অঞ্চলগুলি শাড়ির আঁচল হয়ে আছে

 

পুতুল জিগ্যেস করে, আর কতদূর

কতদূরে পারমিতা ফুল, মানুষের গন্ধে

তার ফুটে ওঠা মানুষের চোখের আড়ালে

কতদূর? আমি জানি, যতটুকু মেনে নেওয়া যায়

সে’টুকু অতীত

যতদূর অস্বীকার করা—সে’টুকু ভবিষ্যৎ

আর জানি অন্ধকার, মূল্যবান ছোটখাট ক্ষতি

নিখিলকে নিখিল নামেই ডেকে ওঠা

 

মান্যতা দিতে গিয়ে কাকে তুমি খুন করে ফেলো?

কাকে তুমি বরফে, নির্বাসনে, বইয়ের পাতায়?

পুঁতি পুঁতি ঘুম জমে পুতুলের চোখে

আমিও প্রশ্ন করি, আর কতদূর?

 

স্থায়ী পুতুলের কত অস্থায়ী রং গন্ধ থাকে

গাল-গল্প, রতি-বোধ, বেগুনী রিবন—

কেঁপে ওঠে বুক, তবু তার

ব্যাধিব্যথা অচেনা ভাষার মত

বিনবিন করে রোঁয়ায় রোঁয়ায়

 

এ বাড়ি রিক্ততার, ধ্বনি বোনে,

অনাদিপ্রশাখা জুড়ে জমে থাকে মেঘ

বারেবারে মেঝেতে আছড়ে পড়ে

পুতুলের বাহান্ন বাসন

 

I forced myself

kicking and screaming

into language

           --Alejandra Pizarnik

 

তার ভাষা ক্যাঁচকোঁচ করে উঠে আসে অস্থিজোড় থেকে

ওর ভাষা পিয়ানোস্ট্যাকাটো, এর ভাষা বেহেডনাবিল, তার ভাষা রীতিসম্মত

 

তড়িঘড়ি ফেলে যাওয়া চাকমা খেলনা খুঁজে পেল রোহিঙ্গা শিশু

 

আজ সারাদিন বৃষ্টি, পুতুলের এইটুকু ডেকচিতে ফুটে ওঠে অগাধ খিচুড়ি

ডুমো ডুমো পেঁয়াজ ও আলু, সামান্য লংকা ফোড়নে

পুতুল সহজ হয়ে ওঠে, সবুজ, নশ্বর

হত্যাগুলি সরে গেছে অবশেষে, আয়নায় শুধু তার ছায়া

এটুকু তো মেনে নিতে হয়, নিজের মুখের ঢালে পৃথিবীর বড় ক্ষয়ক্ষতি

মেনে নিতে হয়। খিচুড়ির ধোঁয়ার আড়ালে বসে থাকে পুণ্যিপুকুর

 

Copyright © 2020                                 Sabyasachi Sanyal                                   Published 1st Apr, 2020.

 

gadha-transparent