প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের কবিতা

 

 

 

প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৫০। কবি ও প্রাবন্ধিক, যদিও জোর দিয়েছেন মূলত প্রবন্ধে - বই দুটি - বিষয়-কলকাতা, দেশভাগ। অনুবাদ করেছেন আলিস মানরো। আটটি কবিতার বইয়ের অধিকারী প্রভাত বাংলা সাহিত্যে আজ অনেক দশক। "কবিসম্মেলন' পত্রিকার এক গভীর বন্ধু। কৌরবে লিখলেন এই প্রথম।



 

 

 

 

 

 

ষাটিয়া প্রহরেও...আজো,

 

কিউমুলোনিম্বাস হয়েই আসো তুমি, খটখটে দুপুরের নির্জন গ্রীষ্মবকাশে, ঝড়বাদলের

সাধ হয়; তড়িঘড়ি সায়া-শাড়ি-ব্লাউজ-পাজামা টেনে নামাও। লৌহশলাকাপ্রতিম

খুঁটি আর তাকে পেঁচিয়ে আঁকড়ে থাকা কুহকিনী ধাতবরজ্জুটি উন্মুক্ত,উদোম

ন্যাড়াছাদে, ভিজিছে নবধারাজলে আগ্নেয় বসন্ত যেমতি, অবরে-সবরে

 

বিদ্যুতবাহী হইয়া উঠিতে পারে পাঁচফুটি ছাদের মাথায় টাঙ্গানো তামার-তার, রৌদ্রদগ্ধ

উলুখাগড়ার বন, ঢের নীচে, যেথা বিদ্যুত-তরঙ্গে ফোটে তার ৭৮ আর.পি.এম ফিসফিস

শীৎকারসিঞ্চিত সংলাপ না!,যেওনা,যেওনাক! মিলনপিয়াসী মোরা, কথা রাখো!

 

গণ্ডিসীমান্তে এলেন রাবণ! এক্সটেণ্ডেবল অঙ্গময় তাঁর ফুল ও চন্দন লহমায় সাংস্কৃতিক বিপ্লব

ঘটাইয়া হাওয়ায় উড়িলেন জানকী । সহাস্যে বলিলেন পেলেনটা জব্বর ছিল মাইরি!

 

উঁহু,পারিনি কিছুতেই!অব্যবহৃত রয়ে গেল হৃদয়টিসাতপাকের লকারে,মন্দোদরীর হেফাজতে

 

 

 

ঢুকে পড়েছি পুতুল-কলোনিতে; শো চলছে 

 

পাপেটিয়ার কিন্তু ঘুমুচ্ছে। পুতুলেরা মগ্ন কাম-কাজে। রাঁধছে-বাড়ছে-কাপড়

কাচছে। হর্ষ মনঃক্ষুণ্ণ হয়নি একটুকও। কান্না নাকি আর ভ্রমণে যাবে না ।

এ-বাড়ি,ও-বাড়ি নিদেনপক্ষে পড়োশির কানেও পৌঁছবে না। মনঃস্থির

করেই ফেলেছেমায়া ও তার আজন্মসহচর বিষন্নতা, প্রতিবেশী নিশ্চিত

ওরা, ডেরা-ও মুখোমুখি বটে, তবে ধন্দ জাগেবোধহয় পরস্পরকে চেনে

না ।

  সন্ধানী দৃষ্টি ছিল না মোটেইআগন্তুকের চোখে,অচেনা হাঁকছে লোকে

প্রমাণ চেয়ে বসল জনতা। হাত-পা নেড়ে বোঝালাম

 

  জমি বাষ্প পাঠায়, মেঘ বানিয়ে ফেরত দেয় আকাশ

আমার ক্ষয় বটে, আত্তীকরণে তো তোমারই সঞ্চয়, ক্রমে, অনিবার্য এক জৈব স্পন্দন...

 

 

 

অং-বং-চং আর তার রংবেরংয়ের টং

 

পাঁচিলে চড়েছে ঈষৎ উজ্বল বিষাদ-বেগনি রং, বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ডটি টাঙিয়েছে

সঙ্গী হিসাবে পেয়েছে গাবগুবাগুব গন্ধের পাঁয়জোর। দেখাদেখি

জন্মকুলুজি খুলে বসেছে রবিশস্য আতিপাতি খুঁজছে নিজস্ব বংশগরিমা,

খেত ও জলবায়ুর সঙ্গ-সাহচর্য, জন্মাবধি আদানপ্রদানের ইকড়ি-মিকড়ি,

সম্পর্কের শিকড় উপস, বুঝতে পারিনা বেদনা কীভাবে হাড়ের অক্ষবৃত্তে এমন

সুস্থিতি পায়, ডটেড লাইন বরাবর স্থৈর্যের দ্রাঘিমায় থিতু হয় দায়বদ্ধতা

নবীন ভাড়াটে হয়ে রক্তমাংসের পুরোনো আবাসে ডেরা বাঁধে

ইশারা-ইঙ্গিতের তন্তুবুনটে তৈরি সীমান্ত পার হওয়ার দুর্মর বাসনা, পারস্পরিক

 

 

দিনক্ষণ স্থির করেছি, ক্যালেণ্ডারেও দাগিয়েছিঃ আগামী জুলাই ২৪

                               

ভাবখানা এমন যেন চড়ে বসেছি সয়ুজ-ইলেভেনে

আদতেখোলা জানালার পাশে,সিট নম্বর এফ-১১ ব্যস!

অনুভূতির সসে জারানো হবে এবার স্বপ্ন-জল্পনার সন্ধি-সমাস

পাথুরে স্ট্যাচুর চোখেমুখে টাটিয়ে ওঠে যেমন মাইল মাইল সমুদ্রচৌহদ্দি

মেঘগাড়িতে চেপে সারা পৃথিবীর শূন্যে উড়ান-মগ্ন হয় যেমন জল

বাড়া ভাতে ছাই দিতে এগিয়ে আসতেই পারে বায়বীয় কুয়াশাচাদর

আর সাঁইত্রিশ হাজার ফিট প্রলম্ব উচ্চতার উদাসীন হঠাৎ দূরত্ব, যোজন-

যোজননীচে, নদীতীরের ঢেউগল্প শুনতে হাজির হল কি মতলবি হাওয়া?

মগজকুটুরি থেকে বার হয়ে বুকের দাবিমঞ্চে উপস্থিত হতেই পারে দেদার

আকাঙ্ক্ষা, শতশতসৌভাগ্য প্ল্যাকার্ডধারী অ্যাড, ঠিক এসময়েই মাথার ওপরে

কেন্দ্রস্থিত ঘুর্ণিবৃষ্টিটি ফুঁৎকারে উড়িয়ে কলিকাতা বিমানবন্দরে নেমে এল প্লেন

কই আর সে ফোলানো-ফাঁপানো শ্রাবণ? নিম্নচাপ-তাপ, ভাপ? ধুত্তেরি, ত্রিসীমানায়

ঢুকতেই দেব না আর ব্যাঙের হিসির মতন দলছুট বৃষ্টির এ্যালবাম... ফের সেই

একতলের বৃষস্কন্ধে স্কাইস্ক্র্যাপারের গর্বোদ্ধত উড়ান-অভ্যস্ত এক শহুরে জনপদ ।

 

 

 

এতোদিনে তবে একজাতি,একপ্রাণ,একতা,আহ-হা!

                          

 

অবিশ্বাসের কাঁটাতার দিয়ে, ইত্যবসরে,লক্ষণের গণ্ডি কাটা হল, আষ্টেপৃষ্ঠে !

ভালোলাগা-ভালোবাসার অনুপম শান্ত দৃশ্যপটে

           কিছু অপছন্দ, কিছু অ-তৃপ্তি, বাকিবকেয়া সন্দেহ আর নিরাসক্তি...

 

ওইসবের মিশ্রণে সেলুলয়েড পর্দা গোছের হয়ে উঠত যে দুটি নয়ন, আয়ত নির্ঝর

হা-হা, লিঙ্গবিভাগ সূত্রে তারাও পেয়ে গেছে নতুন তকমানয়না, নির্ঝরিণী, বেগবতী

ইত্যাদি হ্যানোত্যানো আরো কত কী! সেইসূত্রে নতুন দায়িত্বও কিছু পেয়েছিল বটে...

 

যা কিছু দেখবে, অদৃশ্য খামে সিল করে মগজের ডেরায় পাঠাবে, খুল্লমখুল্লা মতামতও

ঠুসে দেবে, ক্রমাণুক্রমিক ও সারবন্দি: নীরব তরুবর সদৃশ অক্ষরগুলো থাকে যেভাবে

শব্দকোষের চৌহদ্দিতে, ওদের ঘিরে অজস্র অ-চয়িত, বাতিল সহস্র শব্দরাশি

 

সগর্বে ও সাগ্রহে জানিয়ে রেখেছে যে নিঃশর্তে সহাবস্থানে রাজি ওরা, বস্তুত,

প্রতিবেশীই তো বটেবায়ু-মরুত-অপ-অগ্নি-খ,এমনকি হিঁদু-মৌলভীও,আহ!

কি লাভলি !

 

নিপুণ নকলনিবশির গুণেই কেবল ভুলচুকগুলো, বারংবার,ইতিহাসের মোড়ক খুলে ফ্যালে !

 

 

Copyright 2020 Prabhat Kumar Mukhopadhyay Published 1st Apr, 2020.

 

gadha-transparent