প্রত্যুত্তরী কবিতাগদ্য

 

মেসবা আলম অর্ঘ্য

 

অনির্দিষ্ট বাঘ

 

"প্রথাগত পাখিরা আবার ফিরে আসছে। বাজার জেনেছে। বস্তুগত উল্লাসে 

সাদা হয়ে উঠেছে দিন। দরজা জানালার হাস্যকর ঘুমে সাঁতার কাটছে ভয়"[১]

 

চোখের সামনে আচমকা একটা রাক্ষস উদয় হলে তিনটা কাজ সম্ভাব্য ১. হা করে তাকিয়ে থাকা; ২. উল্টাদিকে ঝেড়ে দৌড় দেয়া; ৩. রাক্ষসের সাথে লড়াই করা। কিন্তু যখন প্রতিপক্ষ একটি অশরীরী ভূত, তখন তাকে শিক্ষা দেবার বা এড়িয়ে চলার প্রশ্ন থাকে না। মানুষ তখন হয় পাগল হয়ে যায়, নয়তো ধরে নেয় ভূত বলে কিছু নাই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ব্যাপারটা ঘটে। 

 

আমাদের শহরে দানো নাই। মানুষখেকো বাঘ নাই। আছে অশরীরী ভূত। চারপাশে ভূত কিলবিল করছে, ধূলাপোকার মতো। দরজা-জানালায়, বালিশ-তোষকে। কিছু পাগল মানুষ ভয়ে আতঙ্কে আরো পাগল হচ্ছে। তবে অন্যতম বিশ্বাস হলো ভূত বলে কিছু হয় না।

বস্তুনিষ্ঠ মানুষ নিজেদের মতো পার করে দেন নিজস্ব বস্তুনিষ্ঠ সময়। কাজে, অকাজে। যেন কারও কোনো মাথাব্যথা নাই। তবে মজার ব্যাপার হলো, অনেকের ঘরেই লাইসেন্স করা শটগান থাকে। সতর্কতামূলক সার্ভেলেন্স ক্যামেরা ফিট্‌ করা হয় বাসস্থানের আনাচে কানাচে। ফ্ল্যাটবাড়ি হলে অর্ডার দিয়ে দরজায় অতিরিক্ত তালা লাগানো হয়। একই তলাতে কোনো ফ্ল্যাটের কেউ কারো সাথে কথা বলে না। এক ঘরে জোরে শব্দ হলে পাশের ঘরের ভাড়াটে এসে খোঁজ নেয়ার বদলে পুলিশের কাছে নালিশ করে বসে "আমার হজমের অসুবিধা তৈরি করছে অমুক ফ্ল্যাটের লোকজন"। 

 

ভয়টা যে ঠিক কিসের কেউ নিশ্চিত না। যদিও ভূতের অনস্তিত্ত্বে সবাই নিশ্চিত। তারপরও, নিকটে অমূল্য মণি, রত্ন নিয়ে চলার মতন কী এক উৎকন্ঠা যেন মনের ভিতর ঘাপটি মেরে আছে! অনির্দিষ্ট এক ভয়। টিভি খুললে বিজ্ঞাপন। ফাঁকে ফাঁকে বিদেশে যুদ্ধের খবর। রিয়ালিটি শো'তে কে কোথায় কিভাবে খুন হলো তার বিস্তারিত এ্যনালিসিস। সাবধান। খেয়াল করুন। আপনার ভাগ্যেও এমনটি ঘটতে পারে! ঘটতেই পারে! সিরিয়াল কিলার ঘুরে বেড়াচ্ছে আপনার স্টেটে একজন। এবং নতুন একটি পাব্‌ খুলেছে পাড়ায় ওখানে যান্ত্রিক ষাঁড় আছে। 

 

১৫ ডলারের বিনিময়ে পিঠে চাপুন। বোতামে টিপলেই ষাঁঢ় লাফাতে লাগবে। আপনাকে ছিটকে ফেলতে চাবে। কিন্তু আপনিও কম যান নাকি? বিয়ার পান করুন। ডেট্‌ নিয়ে আসুন। বিশালবক্ষা হলে ডিসকাউন্ট।

 

ডিসকাউন্ট! ডিসকাউন্ট! চলুন শপিংমল। মেশিনে পয়সা ফেললে বেরিয়ে আসবে পরিবেশ-নিরপেক্ষ বাজারের থলি। আমরা সবুজ। থলিতে ভরে তুলুন বস্তুগত উল্লাস। নো মানি? নো প্রবলেম! শুধুমাত্র আপনার মতো সৌভাগ্যবানদের জন্য আছে স্পেশাল ক্রেডিট কার্ড। সুদ নিয়ে ভাববেন না। জীবন কয়দিনের? ফুর্তি করেন!... ...  

 

 

A picture containing person, man, building, indoor

Description generated with high confidence

 

 

 

 

 

 

 

 

যান্ত্রিক ষাঁড়

 

ফুর্তি চলে। কিন্তু চলতে চলতে একসময় ভ্যাবদা মেরে যায়। তখন চাপা পড়া ভয়গুলি আবার মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। দেরি হয় না। 

 

আচ্ছা, ভয়গুলি কি কোনো স্টুডিওতে প্রস্তুত? নাকি থিয়েটারে? নাকি কিন্ডারগার্টেন থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে মাথার ভিতর মাইক্রোচিপের মতো বসিয়ে দেয়া হচ্ছে এসব?

 

কই! কিসের কথা বলো? তুমি তো দেখি লোক সুবিধার না। মিশবো না তোমার সাথে। কোথাও কোনো ভয় নাই। আমরা মুক্ত দেশের মুক্ত মানুষ। আমাদের স্বাধীন ইচ্ছায় কেউ হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। বাই দা ওয়ে, আপাতত বিদায়। আমি তিন জায়গায় কাজ করি আজ-কাল। বিজি এ্যডাল্টিং। খোদা হাফেজ।

 

 

. ঋণপাখি

 

"অলৌকিক প্রবন্ধ থেকে হেঁসেলের গন্ধ 

পর্যন্ত পাখিদের যাতায়াত। এখানে আর বাঘ নেই" [১]

 

যে সমাজে মানুষ একই সঙ্গে ঋণগ্রস্থ এবং ভীতু সেই সমাজকে দিয়ে সব করানো যায়। গায়ের জোর লাগে না। তবে পশ্চিমে ঋণ বস্তুটি আরো একটু বেশি সরেস। এখানে টাকা মানেই ঋণ, ঋণ মানেই টাকা। 

 

"If there were no debts in our money system, there wouldn't be any money" []

- Marriner S. Eccles, Chairman and Governor of the Federal Reserve Board, USA.

 

আধুনিক টাকার কোনো স্বর্ণমান নাই। নতুন টাকা ছাপতে যা লাগে, তা হলো স্রেফ টাকার চাহিদার উপস্থিতি। উদাহরণ- ব্যাঙ্ক যখন টাকা ধার দেয়, তখন নতুন টাকা পয়দা হয়।

 

ছোটবেলায় ভাবতাম ব্যাঙ্কে মানুষ টাকা জমা রাখে, আর সেই টাকা দিয়ে ব্যাঙ্ক সুদের ব্যাবসা করে। আদতে ব্যাপারটা এত সরল মোটে নয়।  ব্যাঙ্ক যেই পরিমান টাকা ধার দেয়, তার মাত্র দশভাগ ব্যাঙ্কের কাছে থাকলেই চলে। বাদবাকি টাকা গায়েবি উপায়ে পয়দা হয়।

ধরেন 'বর্গীয়-জ' একটি সদ্যভূমিষ্ঠ ব্যাঙ্ক। তার কাছে কোনো টাকা নাই। আপনি জনৈক অন্ত্যস্থ-জ, প্রথম কাস্টমার হিসাবে, ১০ টাকা জমা দিলেন। 'বর্গীয়-জ' তখন আপনার জমা দেয়া ১০ টাকার উপর, বাড়তি আরো ৯ টাকা শূন্য থেকে নাজিল করতে পারবে; এবং সর্বমোট এই ১৯ টাকা আরেকজনকে ধার দিতে পারবে।  

এর নাম Fractional Reserve Banking SystemModern Money Mechanics [3] পুস্তিকায় বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়া আছে। জটিল ব্যাখ্যা। পড়তে গেলে সত্যজিত রায়ের গল্পের লাইন মনে পড়ে "সবকিছু সবার জানতে নাই, জানলে 'জিঞ্জিরিয়া রোগ হয়"। 

 

যাই হউক। মোদ্দাকথা হলো, পশ্চিমা মুদ্রাব্যাবস্থা মোটামুটি ভৌতিক। কিলবিল করছে নানা আকৃতির ভূত। কাল্পনিক ডলারের হিসাব কাল্পনিক ব্যাঙ্ক একাউন্টে ভেসে উঠছে, মুছে যাচ্ছে। অথচ সংখ্যাগুলির কতই না ক্ষমতা! ধরেন আপনি বাড়ি কিনবেন। আপনার যেতে হবে ব্যাঙ্কের কাছে টাকা ধার করতে সেই টাকা, যা ব্যাঙ্ক ওউন করে না এমন কি ব্যাঙ্কের কাছে যা নাই। যে মুহূর্তে আপনের ঋণের দরখাস্ত মঞ্জুর হলো, সেই মূহূর্তে উক্ত টাকা পয়দা হলো ব্যাঙ্কের কম্পিউটার মেমরিতে। লক্ষ্যণীয় যে, এই টাকার উৎপাদন রাষ্ট্র থোড়াই নিয়ন্ত্রণ করে। এর নিয়ন্ত্রণভার পুরাপুরি ন্যাস্ত বেসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠানের উপর। পুরো সিস্ট্যামটার লক্ষ্য হলো শান্তিময়, নরম, ধীর, গনতান্ত্রিক, অমানবিকতাবর্জিত এক জার্গনাবৃত প্রক্রিয়ায় ঋণ-নিমজ্জিত একটা সমাজ তৈরি করে তোলা। যেখানে ঋণ শোধ করার একমাত্র উপায় নতুন ঋণ সৃষ্টি।

 

এই চক্রের কোনো শেষ নাই। শেষ হবার নিয়ম নাই। কারখানা এটা। দাস তৈরির কারখানা। দাসপ্রথা সর্বযুগেই ছিল। তবে আধুনিক দাসদের মনস্তত্ত্বও আধুনিক। তারা দাস হয়ে গর্বিত। যেন এইটাই মুক্তি। স্বপ্নপায়রা। খুশি তারা। যেহেতু সমাজে লোক দেখানো আইনের প্রয়োগ আছে। নিরাপত্তা আছে। অতএব তারা নিরাপদ। তবে অন্য সবকিছুর মতো আধুনিক ঋণদাসদের খোশমেজাজটাও উপরে উপরেই। তলে তলে বিরাজ করছে ভয়। কিসের ভয় নিশ্চিত না। কোথায় যেন কী একটা ঠিক নাই। বাজারে এন্টি-ডিপ্রেসেন্টের কাটতি বাড়ছে চক্রবৃদ্ধিহারে। সাইকেয়াট্রিস্টরা সমাজের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য এমন এমন সব ওষুধের প্রেস্ক্রিপশন দিচ্ছেন যেগুলির সাইডইফেক্টে মানুষের মনোবল ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে পুরাপুরি। বিশাল বিশাল মানসিক ওষুধের ফ্যাক্টরি তৈরি হচ্ছে। গোলাবারুদ ফ্যাক্টরির পাশে। কেউ দেখছে না।

 

... ... সুখেই তো আছি। ফাস্টফুড খাচ্ছি। কোমর দোলাচ্ছি নিশিক্লাবের ড্যান্সফ্লোরে। ধারে বাড়ি করেছি। ধারে গাড়ি কিনেছি। ধারে খাচ্ছি মুরগির রান। এখানে আর বাঘ নাই'। বাঘের কথা ভাবি না। ভাবার টাইম নাই। 

 

== || ==

 

 

লেখসূত্র

 

[১] প্রশান্ত গুহ মজুমদার

[২] http://mises.org/library/our-money-based-debt

[৩] http://www.rayservers.com/images/ModernMoneyMechanics.pdf

 

 

Copyright 2018 Mesbah Alam Arghya Published 31st Dec, 2018.

 

মেসবা আলম অর্ঘ্য র জন্ম ১৯৮১, ঢাকা। কবিতা ও ছোটগল্প লেখেন। পেশা সফটওয়্যার নির্মান। প্রকাশিত কবিতার বই - 'আমি কালরাতে কোথাও যাই নাই' (২০০৮), মেওয়াবনে গাণিতিক গাধা'(২০১১), 'তোমার বন্ধুরা বনে চলে গেছে' (২০১১), 'তোমার সাথে আক্ষরিক'(২০১৬)।