যে লেখার কোনো স্মৃতি নেই

 

অনিন্দিতা ভৌমিক

 

[এই লেখার কোনো সুচনাকাল নেই। কয়েক বছর আগে আর্যনীল মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিলেখা- একটি কবিতা যে গভীর মননের দিকে আমাকে ঠেলে দেয়, তাকেই এই লেখার সূচনা উদ্দীপক বলা যেতে পারে। পরবর্তীকালে লেখকের সাথে ইমেইলভিত্তিক পত্রালাপ তাকে আরও কিছু স্ফুলিঙ্গ প্রদান করেছে যদিও। ফন্টের ব্যবহার এখানে স্বতন্ত্র। স্মৃতিলেখা থেকে গৃহীত পংক্তি এবং লেখকের পত্রের অংশ অপেক্ষাকৃত বড় ফন্টে রাখা হয়েছে। এই লেখাকে দ্বিরালাপ মনে হতে পারে, মনেহতে পারে ব্যক্তিগত দুপুর থেকে আসা কয়েক দানা। আসলে একটি বইয়ের অথবা একটি অনুভূতির কাছে ঘুরেফিরে আসার যে সময়কাল, সেটুকুই এই লেখার মূল প্রাণবিন্দু...]

 

আমি দেখেছি যে কোনো চোখের ভেতরে একটা সুড়ঙ্গ থাকে

আর তার শেষে একটা চকমকি পাথর (স্মৃতিলেখা)

 

দীর্ঘকালীন কোনো সংলাপ নয়। বরং চেনা চেনা মুখগুলোর উপর নানামাপের স্মৃতি। অথবা ফুরিয়ে যাওয়া একটা গল্প। ঘুরে-ফিরে সমস্ত ঘর। নস্ট্যালজিয়া। মাঝে পড়ে থাকা দূরত্বের সুতোটাকে খুলে দিই। যেভাবে ছেঁড়া স্বপ্নের শেষটুকু পরিচিত নাম খোঁজে। কখনও অদ্রাব্য অংশ। যাওয়া-আসার মাঝে শুধু একটা টেবিল, পুরনো মানচিত্র।

 

জ্যামিতির সূক্ষ্মতম বিভেদকে

ঠিক এখানে রেখেছি

গোটা বারান্দায় তার নৈঃসঙ্গ

চলে যাওয়া কি এতোটাই পর্যাপ্ত ছিল?

আমি কেবল স্নায়ুতে স্নায়ুতে লিখি তার ক্ষারীয় ধর্ম

কোটরের ভেতর এক শ্রান্ত অন্ধকার

কিছুটা রেডিয়াম কিছুটা ধোঁয়াশা

 

নদী যখন স্মৃতি সে হারায় তার সকল সূত্র

এমনকী জন্মমুহূর্ত (স্মৃতিলেখা)

 

একটা হারিয়ে ফেলা নাম ধরে ডাকছি আমি

রাতের পর রাত হারিয়ে ফেলার গন্ধ

মৃতের চোখের মতো স্থির

স্মৃতির মতো সাবলীল

ছুটতে ছুটতে আবারও সেই কার্ণিশে

অবিরাম বৃষ্টির ঘোরে

না-ফিরে আসার দরজাগুলো ভিজে যাচ্ছে একটানা

আর তখনও ব্যাখ্যা খুঁজে যাচ্ছি

অধ্যায়ের শেষ পাতায় রাখতে চাইছি

পুনঃপাঠের অনুরোধ

 

আমরা আসলে দ্ব্যর্থের মধ্যে বসবাস করি। ভিন্নতার জীবন। যা কাজ করে এক সাম্যের ওপর, resonance-র ওপর, গতিছন্দের ওপর। একটা হাত একদিকে নড়া থামালেই অন্য হাত নড়ে, নিয়মে নিয়ম বাঁধে। যেটা স্বাভাবিক, একদিন গভীরে হাত দিয়ে, চোখ রেখে মনেহয় এটা মোটেই স্বাভাবিক নয়। বিস্ময়কর। যে কোনো ছন্দই বিস্ময়কর। জানালার বৃষ্টির জল খাটের মাথার হেডিঙের ওপর পড়ে, যে খাটে মানুষ-মানুষী ভালোবাসছে, ছন্দে ওঠাপড়া করছে দুটো শরীর, কাঁপছে খাটের হেড, আর তার ওপরে পড়ে বৃষ্টির জলও অন্যভাবে কাঁপে, নিজের দোলা মেশায়; হাওয়াও বুঝে যায় নতুন কম্পন আসছে, সেও অন্যভাবে খেলায় পর্দাকে, খুলে দেয় দরজা, উড়িয়ে দেয় কাগজের পাতা। আলাদা আলাদা ভাবে দেখলে সবকটা দ্রুতি, যাতায়াত, দোলাকে বিচ্ছিন্ন মনে হয়, কিন্তু একটু পিছিয়ে গিয়ে দেখলে বুঝি না, আসলে একটা বড় ট্রাপিজ চলছে কোথাও, প্রত্যেকটা নড়চড় নিয়মে বাঁধা, গানের সুরে-তালে

 

ঠিক চোখের সোজাসুজি তাকালে, কতগুলো অবয়ব পাওয়া যায়। শুধু রেখার ভেতর নমনীয়। গুটি ছাড়িয়ে টেনে নিয়ে যায় এক শহর থেকে নানারঙের প্রকোষ্ঠে। তবুও স্মৃতি হারিয়ে যায়। সুতোয় সুতোয় বাঁধা অন্ধকার থেকে হারিয়ে যায় ধূসর ও ভারী দ্রবণ।

আর আমি হয়তো ফিরছ ব্যক্তিগত পংক্তি নিয়ে। ব্যক্তিগত কিছু চৌহদ্দি, যাদের ভেতরে বৃষ্টি হয় অবিরাম। পলিতে পলিতে জমাট হয় বৃত্তাকার যৌগ।

 

কথা বলতে শুরু করি এই সম্ভাব্য বাস্তবতার দিকে তাকিয়ে। একটা শাদা জরুরী কথা। মুদ্রিত অক্ষর পর্যন্ত যার ধ্বনি, লাল পোশাকের মুখোশ, সংস্থিতি ও বক্রতা নিরাপদ থাকে। ভেতো শান্তির মতো নিরাপদ থাকে সবটুকু অনিশ্চয়তা।

 

বস্তু বনাম আত্মার এক চিরকালীন ঝগড়া আছে। একবার এখানে এ নিয়ে এক মার্কিন কবিতার আলোচনায় আমি এই প্রসঙ্গটা এইভাবে তুলি যা আমার লেখাতেও আছে যে ওয়াল্ট হুইটম্যানের Leaves of Grass কবিতায় এক জায়গায় এমন একটা পঙক্তি আছে And if the body were not the soul, what is the soul? যে উক্তির বিপরীতে আমাদের রবীন্দ্রনাথের অসংখ্য কবিতার পঙক্তিকে বসিয়ে বলা যায় ঠিক উল্টোটা ওয়াল্ট, and if body were not the soul, what is body?

 

কিন্তু যা জড় নয়, প্রাজ্ঞ নয়, স্বপ্ন ও জাগরণ নয়, বরং উভয়েই। এক নিরাকার জ্ঞান, আত্মা নামক এক ধ্রুব বাস্তবতা, তার অনির্দিষ্ট যাত্রাপথ ও স্মৃতির দূরত্ব ঠিক কতোখানি? কতোটা দূরত্বে সেই আদিম শূন্যতা যেখানে সৃষ্টির স্পন্দন, সৃজনের আলোওংকারে, অবয়বে, কোষীয় বিভাজনে।

 

 

সেতুর উপর দাঁড়িয়ে বুঝতে পারি

আমি কেবল নিজের মৃতদেহকে দেখছি

টেনে ঘেঁষটে আনা ছত্রভঙ্গ রেখা

বন্ধ চোখ

আমি দেখছি কিভাবে উজ্জ্বল শরীরের বাঁকে জমে উঠছে কুয়াশা। নিচু বাসস্থানের দিকে স্তরে স্তরে জমে থাকছে গভীর স্যাক্সোফোন।

 

আমি নিজের স্বর খুঁজি গলায় হাত দিয়ে। কোনো পরিচিত উচ্চারণের আদলে যার ভঙ্গি ছুঁয়ে থাকে না। বরং এক মুহূর্ত, এক অমর বস্ততকণিকা। অরণ্যের গভীরতায় ছড়িয়ে থাকা ঘন নীল ধমনী।

 

হয়তো তুমিই কেবল দেখতে পাবে ভাঙা স্মৃতির গায়ে পড়ে থাকা এই মৃতদেহ। সুদূর। বিষন্ন। আর এটুকুই আমি, হাজার হাজার ছিঁড়ে যাওয়া পঙক্তি নিয়ে যে কেবল নিজেকে খুঁজে যাচ্ছে। ক্ষণজন্মা এই ঘাসের শরীরে খুঁজে যাচ্ছে নিজস্ব অনুরণন।

 

Copyright 2018 Anindita Bhowmik Published 31st Dec, 2018.

 

নিন্দিতা ভৌমিক (জন্ম ১৯৮৬)-এর বড় হয়ে ওঠা প্রায় সমগ্র উত্তরবঙ্গ জুড়ে। উদ্ভিদবিদ্যা বিষয়ে স্নাতকোত্তর করেন উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বর্তমানে কর্মসূত্রে জলপাইগুড়ি জেলার বাসিন্দা। জেলা বিচারবিভাগের অধীনে কর্মরতা। কবিতা বলতে বোঝেন, নিজেকে খুঁজে পাওয়ার অভিমুখ। সেখানে হয়তো জোলো হাওয়া, হয়তো পৌরাণিকতা, হয়তো মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করা নিজের অনুনাদী কন্ঠস্বর। আর প্রবেশের চেষ্টা অধ্যায়ের সেই মূল বিন্দুটিতে। নিজের অস্তিত্বের ভাঙাচোরা প্রত্নতত্ত্বে।