প্রত্যুত্তরী কবিতা

 

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

 

 

অসাড়লিপি

 

 

এই কবিতার সূত্রপাত এমে সেজেয়ারের দেশে ফেরার খাতার সঙ্গে এক দ্বিরালাপের উদ্দেশ্যে। তারপর জুড়ে যেতে থাকে আমার নিজের দেশে থাকার খাতা, এক সঙ্গীতহীন সুড়ঙ্গ। ২০১৭ র নভেম্বরের এক সন্ধ্যায় ১৩ বছর বাদে দিল্লিতে দেখা হয় চিলের কবি রাউল সুরিতার সঙ্গে। তাঁর দীর্ঘ ও বিরাট প্রেক্ষাপটে লেখা দীর্ঘ কবিতার শৈলী নিয়ে এক আস্ত সন্ধ্যা। দাবিদ উয়ের্তা নামক দীর্ঘ কবিতার মেহিকানো স্তম্ভের সঙ্গে দীর্ঘ চিঠি চালাচালি, এবং নব্য বারোক রীতির সঙ্গে পরিচিত হওয়া... আমাদের সময়ের কবিতা বোধহয় শিকড়বিমুখ... একঘেয়ে ভালো-কবিতা পড়ে ক্লান্ত মাথার দীর্ঘশ্বাস

 

 

 

 

না, তুমি দেখতে পাওনি নাকি দেখতে চাওনি দীর্ঘ সজল বাগানের মধ্যে দিয়ে যে শরৎ বিকেল তার গায়ে জমা হচ্ছিল হিংসা, মাংস কাটা পর্যন্ত, চামড়ায় আঁচড়ের দাগ পর্যন্ত তুমি অপেক্ষা করে গেছ, নিজের ঠোঁটে ঝুলে থাকা রক্তের ডেলা, পেটে লুকনো বিবমিষা, ছড়িয়ে থাকা গা ঘিনঘিন গলির থকথকে মানব ও জান্তবের দিকে দেখতে চাও না তুমি, যে রাস্তা দীর্ঘ এবড়ো খেবড়ো বমি করে দিয়েছে গ্রামের পর গ্রাম, তীব্র হয়েছে মানব সংখ্যা সহস্র জনস্রোত ক্রমাগত শহরে আসছে তুমি তাদের সংখ্যা ভেবেছো, সামনে ঝকঝক করছে তোমার না দেখা আর তার ওপর অসাড় তার তোমাকে বশ করছে

 

আমি আমরা ক্রিয়াপদ

খাবার টেবিলে ছড়ানো

আমার ব্রাহ্মণ ভাষা

জানলা ও ভাষাবিজ্ঞানের রক্তে

প্রবাহিত চির-অব্রাহ্মণ দেশ কাচের টুকরো

 

 

আমরা রক্তে অনুভূত কাচের পৃথিবী দূরে ঠেলে দিই

 

 

আমরা অসাড়প্লাবিত টেবিল ও তার ব্রাহ্মণ ভাষাক্ষেত্রের বুকে আরেকটু সময় নামক মোম রাখি, (তাতে কি উত্তাপ আসে?) এই অক্টোবর প্লাবিত দুনিয়ার রং পুরনো ব্যবহৃত মোমবাতি আমরা অপেক্ষা করি

 

যাতে আমার মা তার অস্পষ্ট গর্ভ নিয়ে এখানে সামান্য ব্রীড়ায় বাবার সামনে দাঁড়ায় যাতে আরেকবার তলপেটে লাথি ও ভাষার শরীরে আরেকটা সংখ্যা ছড়িয়ে যায়

 

 

এই বিস্তৃত ভাষাক্ষেত্রের সামনে মা ও তার গর্ভ আসলে এক গোপন দেশ। আমি এক কাঠের টেবিলে ব্যাপ্ত মোমের আলো

 

 

আমি আর সময় ক্রমাগত ভেসে যেতে থাকি, আমি আর আমার মায়ের ব্রীড়া দুজনে মিলে মায়ের অযৌনতায় ধাক্কা দিতে থাকি, এভাবেই আরেকপ্রস্থ ভাষা ছড়িয়ে পড়ল বাদামি ফোঁটায়, ডাক্তারের অ্যাপ্রনে

 

ভারি শব্দের পেরেক গেঁথা ভাষা

অভিধানে না ওঠা চলিত অর্থ

রক্তে বহন করা দৃশ্য-টুকরো

আবেগ ভাসিয়ে রাখা রচনাশৈলীর ফাতনা

 

তুমি জানতে কীভাবে স্বপ্নের ভিতরে নীল একটুকরো নদীখাতের উপলখণ্ড রেখে আসতে হয়। আমার বাঁচা ফিসফাসের মধ্যে টানটান এক নৌকার পালের মত, আমি জানি এই আগুন সমুদ্র থেকে কোনও পশু কেউ তুলে আনবে না আমাদের শান্ত চাউনিতে ঝলসে নেবার জন্য অথচ আমি তোমাকে বাধ্য করব এই দেশ, শহর ও বিস্ফার এই প্রবণতাহীন হত্যানন্দে যে বালক স্তব্ধ পোশাকের নন্দন রেখে যাচ্ছে, আমি জানি তার সামনে এই বিকেল ওপচানো সন্ধেগুলো কোনও উপহার নয়। প্রতিহত যে দরজা তোমার সামনে তাকে আমি নিপুন বন্ধ বলে ডাকছি তোমার স্বর ভারি পদক্ষেপে কেঁপে ওঠা কোনও বিস্মৃত গভীর জল, আমি তার সামনে ক্ষয়ে আসা এক প্রতিরোধ। এই শ্মশানদীর্ঘ চলার সামনে যতগুলো পোড়া বসবাস ও চলন তাদের মধ্যে ঈশ্বরগন্ধী পাথর, যৌন স্যাঁতসেঁতে অগাস্ট-শ্যাওলা আমরা নীচু হয়েছি, তুমি আঙুলে তুলেছো ভিজে গাঢ় ছাই রং, এরপর শুধুই পশুভ্রূণ-কুঁকড়ে থাকা আর কিছু নেই অসাড় ক্রমশ মেলে দিয়েছে রঙিন সামিয়ানা। গোটা শহর বয়ে যাচ্ছে গ্রাম থেকে পোকা আনতে, অথচ আমার তেমন কিছু নেই, বন্ধুরা বিশ্বাস করতে চাইবেনা এই দৃশ্য, শুধু তীব্র অসাড়ের জ্যোতিপ্রকাশের মধ্যে শরীর জুড়ে বেড়ে ওঠা জ্বর ও বমিভাব লুকিয়ে দেখতে পাচ্ছি ভিজে ছাইয়ের দাগ ধরে ঘসটে চলে গেছে আমাদের ভাষা, আমরা স্বীকৃতি দিইনি দূরের লেখা।

 

আমাদের স্তব্ধতা ও বিরোধের মধ্যে অঙ্কুরিত হয়ে উঠেছে এই সময়ের কন্দমূল, আমরা সব ভুলে থাকার চেষ্টায় ফুটিয়ে তুলেছি মাটির বিকৃত মুখোশ যেন অন্য কেউ নজর না দিতে পারে আর যে শিশুটি ধুলো তার মাঠ বরাবর মেলে দিচ্ছি অতীত রঙের আশ্বিন, যাকে মায়াবী নাম দিয়ে বাংলার আয়নায় ঠেসে দিয়েছি আমরা। সেই আয়না আমাদের নিয়ে ফেলছে পরপর মানুষ ও বসতি ঠিকরে দেওয়া সর্পিল রাস্তা যাকে পথ বলে ডাকতেই মসৃণ হয়ে যায় গাঢ় কালিতে লেখা পুরনো পোস্টকার্ড বন্যা বা সন্তান জন্মের খবর। একগুচ্ছ মরা পাতার মধ্যে দিয়ে শামুক রঙের বিকেল, তার শরীরের গন্ধ মিশিয়ে দিচ্ছি চিৎকারে যা এতদিন কাচের জানলায় বাষ্প হয়ে ছিল।

 

যখন অসাড় ওঠে এই দৃশ্যসমূহের ওপর, আমি স্থির দাঁড়িয়ে থাকি উঁচু এক বাড়ির ছাদে, আমার অন্তরতম ভয় আমাকে ধর্মের ঘন্টাধ্বনি শোনাচ্ছে, আর ছিটকে উঠছে রাস্তার স্পিডব্রেকারে কোনও তরুণ যুগল, মেয়েটার বুক ঘষটা লাগলেও গতির শরীরে কোনও যৌনতা থাকে না আমরা পরপর ভেসে যেতে থাকি, ঠিকরে উঠতে থাকি জনপ্রিয় গানের পরিধিতে। আমরা স্পষ্ট দেখি কীভাবে ইঁদুর ঢুকে তছনছ করে দিচ্ছে আমার কাঠের মস্তিষ্ক, চুপ করে দেখে যাব যেভাবে জীবনী আমার মধ্যে চালান করে দিয়েছিল শেষ ট্রেন ঢোকার আগে বালিগঞ্জ স্টেশানের অন্ধ ভিখারিদের খাওয়া বা সকালের শহরগামী এক ট্রেনের শিশু শ্রমিকে ঠাসা কামরা।

 

আমি জটিল কল্পনায় ঢুকে যাওয়া আমার জীবনেরই অংশমাত্র। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে আমার সামনে যে ভূখণ্ড তা কোনওভাবেই কোনও শূন্য থেকে শুরু করা ভাগ্যবিজয়ীর নয়। অথচ সেভাবেই কেউ তলিয়ে যাচ্ছে পোষা গুন্ডা, ফ্লাইওভার, বস্তি ও কংক্রিটের গলিতে চলা গুলির শব্দে, এবড়ো খেবড়ো ভাষাবিন্যাসের মধ্যে এই চিরশান্তির দেশ, এই শান্তিপূর্ণ, শান্তিময়, শান্তিরঞ্জিত দেবশঙ্কুল দেশে প্রতি ঘরে অন্ততঃ একবার ধর্ষণ হয়েছে; প্রতিটা শহর যখন নিজস্ব ঘায়ের ওপর অসাড় করে দেওয়া সিনেমার প্রলেপ লাগায়; প্রতিটা ফ্লাইওভারের নিচে কাদা রঙের খাবারের উপরে ক্ষুধার্ত দাঁত, ভোরের মুখে হিংস্র যৌনমিলন, আমার দম বন্ধ হয়ে আসে, আমার কিস্যু করার নেই ভেবে গোষ্ঠী নামক শব্দটাকে ব্লেড দিয়ে কাটি অভিধানে। উপর থেকে দেখি প্রবাহ বা সময়ের অন্যান্য চিহ্নের গায়ে আমাদের ছায়া ঘষছে, ছায়া ও তার উড়িয়ে চলা ধুলোয় কোনও দেশ গাঁথা নেই।

 

বারবার বলছি সরে আসার কথা, আমার ভাষা ও স্তব্ধতা, সমস্ত রকমের মাংসল কামড় যেখানে উগরে দিয়েছে সহজাত, উন্মুক্ত প্রান্তরের উপর ছড়িয়ে থেকেছে হজম না হওয়া খাবারের দুর্গন্ধ নিয়ে আমার চাতুর্য। ভাষা ও দেশজ শব্দের মধ্যেকার ব্রাহ্মণ্য দূরত্বকে অস্বীকার করার মত সজোরে গিলে নিচ্ছি আমার ইচ্ছে, বলছি হ্যাঁ আমার প্রতিটা জনপ্রিয় গানের লিরিক লিখতে ইচ্ছে করে, হ্যাঁ স্তনসন্ধির লোভই আমার মাংসল আত্মা আর তোমরা মেতে উঠছো উৎসবের সহজে, চেটে চলেছো উৎসবের সাদা আলোর গুঁড়ো, নিশ্বাসে টানছো তাকে, টেবিল থেকে সারিবদ্ধ সাদা গুঁড়ো

 

ছায়ার মাতৃভাষা এই থেমে থাকা। আমার প্রতিটা চিন্তাসূত্রের পিছনে একটা শীর্ণ নদী, গ্রামহীন বসতিহীন কিছু চিন্তাস্রোত, যাদের সঙ্গে কথা বলা যায়নি শ্রেণী বিভাজনে, প্রতিনিয়ত বিভেদরেখা আমাকে নিয়ে ফেলেছে দর্শকের ভূমিকায়, অথবা সন্ধানী খাতায় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি সেই দূরত্বের ধাতব গন্ধ চুষে নিই; ভাবি কীকরে চলে গেল আমার ভাষা, আর এখানেই ভেঙে আসে আমার অস্তিত্ব আমি চিৎকার করে বলতে চাই আমার ভাষা বলে কি কিছু বাকি নেই; আমার শরীরে শুধু ছড়িয়ে রয়েছে বহনের চিহ্ন, আঁচড় ও ভারি হয়ে থাকা থকথকে প্রতীক্ষাপুঞ্জ, হাঁ-মুখ, কাঠবাদামের গাছ, শরৎ ও উগ্র অসাড়

 

 

 

শরীরের হিংস্রতা আমি মেনে নিয়েছিলাম, চোখের আঘাত, মাড়ির উপর দিয়ে ছড়িয়ে যাওয়া শিহরন, যার সমগ্র দাসত্বে আমি রাজি ছিলাম, নিজের প্রচলন চেটে মুখের শিথিল পেশিতে আমি রেখেছিলাম আরাম, যাতে সে আমার আসল চেহারা না দেখতে পায়, যাতে ওর কমবয়সী শরীর শুধু মুগ্ধতা পায়, আমি জাগিয়ে রেখেছিলাম শুধু ছোট উড়ানের জ্বলন্ত পতঙ্গ। বারবার তাদের নিভে যাওয়া ও নতুন আত্মবিশ্বাসের উড়ান। সেখানেই কমে এসেছিল আমার চেনা জগতের পরিধি, আমি মিশে থাকতে চেয়েছিলাম বালির মধ্যে কাচ, আমি অবহেলা করেছিলাম আমার প্রকৃতি ও নদীখাতে বয়ে আসা শব। কেই বা উজান ফেলে অন্য দিকে যায়!

 

সেইসব সম্মোহনী মাথা নাড়া, সেইসব হ্যাঁ-সূচক তীব্রতা, তখনও লাফাচ্ছে পিছনের পরিচিত দিন সদ্য ধরা পড়া মাছ। আমি পরতে পরতে জড়িয়ে যাচ্ছিলাম আমার সকাল ও সন্ধের মধ্যে মোটা হলদেটে পর্দা। আলো-বাতাস সহ সমস্ত অস্পষ্ট ইঙ্গিত আমি এড়িয়ে চলছিলাম, শুধু ভিতরের আলো। দ্রুত চলা দিনগুলোর এফোঁড় ওফোঁড় করে দেওয়া সহস্র আলোক বর্তিকা আমাকে প্রতিদিন হিঁচড়ে এনে ফেলছিল এক সামুদ্রিক বিহ্বলতায়। অজানা ভাষার গান চিহ্নিত করছিলাম নিজের বলে।

 

নিজের কেউ টের পাচ্ছিল না

অথচ সবাই বুঝতে পারছিল আমার ভাষা দুর্বলতা

সুর-দুর্বলতা

কথা ও অন্বয়

আমার সর্বাঙ্গ তীব্রতম ভয়ের মিনার

লুকোতে চাইছিলাম আমার প্রবণতা

আমি স্পষ্ট আবিষ্কার করছিলাম এক বৃত্ত

যার পরিধি বরাবর আগুন

আমি তার কেন্দ্রে এক বাঁকা বিস্ময়সূচক চিহ্ন

ক্রমশ রং হারাচ্ছিলাম

 

এই সেই অসাড়! এক অহংকার ও অবহেলার শরীর থেকে জন্ম নেওয়া এক ধনুষ্টকংকার। এই তার সর্বগ্রাসী আঘাত। আমার বাক্সে ঠাসা দিন ও তার বিস্তারের একঘেঁয়ে ডানার মধ্যে ভরে দিয়েছে উচ্ছ্বাসের আগুন

 

এই সেই মুহূর্ত যখন আমি চাইছিলাম সামনের ন্যাড়া গাছকে তার এপ্রিল সমেত উপড়ে আনতে, উপড়ে আনতে শিকড় সমেত জলদ! যেভাবে এই তীব্র গরম হাওয়ায় আমার অপেক্ষা জমে উঠছিল সমস্ত বাসস্টপে, সমস্ত বাড়ি ফেরায়, সমস্ত টেলিফোনে -- আমি চাইছি আমার সমগ্র ক্লান্তি ও স্বর ঢেকে দিক অসাড় -- আমার এই প্রতিদিন না যেতে চাওয়া ক্লাসের দিকে বাড়িয়ে দিক তার বাহ্যিক পুষ্পল!

 

পরপর ঢুকে যাচ্ছিলাম গলি থেকে পেঁচিয়ে ওঠা গ্রীষ্ম সকাল অব্দি। ঢুকে যাচ্ছিলাম প্রতি মুহুর্তের চুম্বনস্পৃহায় নোনতা হয়ে আসা জিভ অব্দি। প্রতি মুহূর্তের হালকা কামড়ে জাগিয়ে দেওয়া স্তনবৃন্তের কুঞ্চন অব্দি, সমস্ত পেঁচিয়ে ওঠা দুপুরের সিঁড়ি দিয়ে নিঃশব্দে নেমে যাওয়া বেড়াল অব্দি । আমি বিচ্ছিন্ন এক স্থান ও কালের উপর আড়াআড়ি পড়ে থাকা চাতাল, আমার ভিতর দিয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে সবাইকার ফেলে দেওয়া অতিরিক্ততা। এই অপেক্ষা না করতে পারা ছটফটানি আসলে গভীর জলে শব্দের প্রতিধ্বনি, সবাই চোখের বাইরে ডুবে, ঘুম থেকে উঠে আবিষ্কার করা চামড়ায় আটকে থাকা পতঙ্গের পা

 

আমি বলতে পারিনি কেন খুলে যাচ্ছিল সব দরজা, কেন প্রতিধ্বনিময় সব চাহিদা, সদ্য কাটা হাড়ের মত হলুদ ও সজীব সব ছটফটানি, আমার সামনে মেলে ধরছিল এক দেয়াল

 

এভাবেই জমা দিন, মাথা নামানোর ঘর, সব বুঝেও আমি পুরনো কাউকে পরীক্ষা করে গেছি, ঠেলে দিয়েছি সমস্ত রকম রাস্তায়, বুঝিয়ে দিয়েছি তাকে আমার শুকনো নদীখাতের চৈত্র আসলে তার নয়!

 

এখানেই লাফিয়ে ওঠে যাবতীয় কল্পনা,

ঠিকরে ওঠা গরম লোহার টুকরো

চোখের মধ্যে দিয়ে ক্রমাগত

একটা এপ্রিলের ধুলো রাস্তা

পায়ে চলা জলজ প্রলেপ

আমাকে ভুলিয়ে রাখা

 

আসলে ভুল বলে কিছু হয় না

আমাদের ঠিকরে ওঠা সময়

যখন গোটা দুনিয়ার ওপর

অজস্র ছিদ্র করে দেয়

ঢুকে আসে আলোর পর্দা

তখন বেরোন ছাড়া কোনও উপায় নেই

এক সামান্য অসাড়কাঠি

সমস্ত পেরিয়ে ভরে দেয়

চারপাশে আলোর গরাদ

 

আলো আসলে একটা ডেলা, আমাদের গ্রীষ্ম প্রবণতার মুখে জোর করে ঠেসে দেওয়া নুন, অথচ আমরা চেয়েছি সামান্য নোনতা আমাদের গ্রীষ্মরোধী লেবুর জলে ছিটিয়ে দিতে। এই আলোর ডেলায় হোঁচট ও সামনে ক্রমাগত বড় হয়ে ওঠা উৎসব জাতীয় ঝোপ আমাদের আটকে ফেলছে, দৃষ্টিপথ ভরে যাচ্ছে আনন্দ-মানুষে, রাস্তা ও নদী, স্থবীরতা ও চলন ভরে উঠছে আনন্দে, আমরা মাটিতে পা ফেলে স্পর্শ করছি তপতপে আনন্দ অসাড়!

 

এক অবিচ্ছিন্ন আনন্দ প্রবাহ, অবিচ্ছিন্ন থকথকে আলোর ফিতের মধ্যে পাখা যাপটাচ্ছি আমরা, পিছলে গেছে সমস্ত দুঃখের দিন, চোখ থেকে দৃশ্যচূর্ণ মিশে যাচ্ছে আলোয়, -- এক দীর্ঘ দুনিয়া তার বিশাল মানবজন্ম এক অতিকায় আলোর থকথকে চলমানতায় পরস্পর বিচ্ছিন্ন নিশ্বাস নিচ্ছে, বাইরে আর কিছু দেখা যাচ্ছে না

 

 

 

এখন তোমার শরীরের সামনে কিছু ধাতব বুদবুদ

গলায় জ্বালা ধরানো কিংশুক সকাল

কীসের অপেক্ষা করছ? কেন চুপচাপ সহ্য করছ?

তোমার মাতৃভাষা বা এই বাড়ি

এই শব্দ বা ধ্বনি কেবলমাত্র তার মৌখিক রূপে ফিরে যাবে

সহস্র মানুষ তার দৈব ভরসার

ফ্যাকাশে চাদরে মেলে দেবে চালের গুঁড়ো,

তাহলে কীকরে থাকবে তুমি?

তোমারে এত বছরের লালিত অদৈব

সুড়ঙ্গের মধ্যে দিয়ে পাচার করে দেওয়া

সব ভালোর রাজত্ব এটাই তো অসাড়!

তুমি বুঝে নিচ্ছো অনেককালের অভ্যেস ও তার আঁচড়

তুমি নিজেকে কীকরে বিচ্ছিন্ন রেখেছো সেটা ভাবো

মাথা তুলে ভাষার কাঠামোয় ফেলে রাখো ল্যান্ডমাইনের অনিশ্চয়তা

 

 

কতখানি বাস্তবতা সহ্য হয় আমাদের?

যে লোকটা বাড়ি থেকে মাংস কিনতে বেরিয়ে নিজেই টুকরো হয়ে গেল

বা আরও নিশ্চিত তোমার শহরের মানুষের পলিথিন জীবন

কোন দিকে যাবে তুমি? আচমকা মেক্সিকো থেকে আসা মেসেজ পড়লে

পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্বোধ্য আর্তি আমাকে ছেড়ে দিন আর তার পরেই

শুনতে পাওয়া গুলির শব্দ অথচ আমাদের রাস্তায় নামা নেই। পরপর স্লোগান গিলে

ফুলে ওঠা চিন্তার পিছনে শুধুই তোমার মৃত্যু। কতদূর সকাল তেতো মুখের রাস্তা?

 

 

উড়ান রহস্য আমরা বুঝে গেছি ব্যবচ্ছেদ করে।

যেভাবে মাথার ভিতরে থাকা ফাঁকা নক্ষত্র

যেভাবে ছুঁয়ে দেখার বাস্তবতা বিক্ষিপ্ত

নক্ষত্রই একমাত্র উৎস বুঝে নিয়ে

ভাষা ধ্বংসের গায়ে গিঁথে রাখছি ধাতব মুখোশ

 

 

 

চোখ এক মস্ত পরিসর

আমার দৃষ্টির কোনও পোশাক নেই

বাস্তবতা ব্যবহৃত সংসারের ছায় পরিসরে

শুধু তোকে দেখবার জৈব রং

ঠাণ্ডা সমুদ্রের তলা থেকে

রক্তে উঠে আসে

 

 

অক্ষরের স্বর্গ সম্ভাবনা নিয়ে ভাবি

নির্মিত ভাষ্যই কি আমাদের?

রক্তে নিশ্বাস নেওয়া ক্লান্ত ঘোড়া

মাথা নাড়া আমাদের দিন

শুধু তোকে দেখবার চোখ থেকে

প্রতিফলনের দিকে

পরপর আয়না বসানো সপ্তাহ

এভাবেই দূরত্বকে ছবি বলে ডাকা

 

 

এভাবে একেকটা দিন বন্দিত্বের মধ্যে

দিনের খোলস ভেঙে আরেকটা দিন

ক্যালেন্ডার ও না শোনা শব্দের খোলে

সপ্তাহ নামক বছর

ধৈর্য ও স্তব্ধতার মধ্যে যতটুকু রক্ত লাগা

কাটা পালকের ড্রাম আমার সমস্ত ভয়

এই বুঝি আক্রমণ এই তার প্রতিরক্ষা কৌশল

আবার যখন উঁকি মারছে একঘেঁয়েমি ও তার ঢেকে রাখা মুখ

আমার কিছুতেই না বেরোতে পারা

সোজা হয়ে না বসতে পারার

মাঝখান দিয়ে

চলে যাচ্ছে দীর্ঘ

এক হাইওয়ে

গাড়িহীন

আমি স্থির দর্শক

গন্তব্য রহিত

একধরনের বাক্সে ঠাসা রোদ ও তার আদর

 

 

 

কে কোথায় পাচ্ছে ভাবি, কতদূর পালানোর কথা

যে ফুল রেখেছে কেউ ডাইনি বিদ্যা ডাকিনী শাস্ত্রে

ডাক নিশি ও অন্যান্য কবজ নিয়ে

ভাষা অপঘাত থেকে দূরে

সেখানে দাঁড়িয়েছে আমাদের অতীত

কিছু যতিচিহ্নের বিরতি নিয়ে

আমাদের শীর্ণ কোনও ফুলেশ্বরী নদী

 

এখানেই কি দৌড়? এক অবিশ্রাম তোমাকে খোঁজে

ক্ষত বা প্রলেপ নয় সে কি তোমাকে পায়?

পেলেও কি বলার মত শব্দ থাকে ঠোঁটে?

বা তুমি কি তাকে চেনো?

 

অচেনা ভাষা জগতের মধ্যে

এই যে আধো-আলোকিত গলি

সিঁড়ি, বৃষ্টি ও অগাস্টের হলদেটে বাল্বের আলোয়

দাঁড়িয়ে ওঠা ছোট শহরের শিহরন

অসমাপ্ত বাক্য ও আধো-নিঃশ্বাস জড়ো হতে থাকে

 

মাথার ভিতরে পাড় ভাঙা, আমাদের মাতৃভাষা

যে চরাচর কাঠের দেবতামূর্তি

তাদের উচ্ছ্বাস নাম দিয়েছে নদীদের

এখানে কি নতমুখ হওয়া যায়?

 

 

 

এই যে গ্রীষ্ম আসছে, বসন্ত নামক মোষের দুধের রং আলোতে

রাস্তাই তোমাকে খঁজে পাচ্ছে বারবার

বেরনোর সব কৌশলই তোমার জানা

অথচ ছাড়ার পথ সুগন্ধ ছড়িয়ে উঠে যায়

সর্পিল পুরনো সিঁড়ি, ধাতব মতাদর্শ

সীমা এক বদ্ধতার মাঠে ঘাসের গন্ধ

সে তো নিজেরই মুখ নদী থেকে শুষ্কতা থেকে তুলে আনছে

ভুলে যাওয়া এইটুকু শক্তি তার

এ সময় নিজের, এখানে হল্কায় পুড়িয়ে নিই

অসামর্থ, গ্রাম ভেঙে ফেলবার যাবতীয় দিক-নির্দেশ

 

 

 

এখান থেকেই পরপর বেরনোগুলো আটকে যায়,

পরপর নির্দেশ আসতে থাকে,

আমার সামনে ক্রমাগত বড় হয়ে উঠতে থাকে বর্ণমালা

তাকে সাজাবার যাবতীয় অস্ত্র যাকে ব্যাকরণ বলে জেনেছি এতকাল

অথচ তেমন কিছু জানিনি বা বুঝিনি

এক অভ্যেসের সামনে আমার শখের অস্ত্রসম্ভাবনা দুমড়ে

ফেলে দিতে চেয়েছি আর এখানেই বোড়ে হয়ে উঠেছে

ক্ষতমুখ ক্ষত পদক্ষেপ ক্ষতরঞ্জিত সমাগম

আমার প্রিয় ছড়িয়ে যাওয়া বীজের গন্ধ

সার দেওয়া খোলের গন্ধ, আলে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা শৈশবের

নাকে লেপ্টে থাকা আচমকা সরীসৃপ যাকে ফেঁউটি নামক

নিরীহ শব্দের মধ্যে ধরলেই ভয় চলে যায়

এই ভয় না পাওয়ানোটা একটা খেলা

অভিধান খেলে এসেছে প্রাত্যহিকতায়

 

 

 

তুমি ধরতে পারছো না শব্দটার জোর, মেপে নিচ্ছ না করতে পারাটাই ক্ষমতা এও বুঝতে পারছো তুমি না হয়ে উঠতে পারবে না কখনও। বুঝতে পারছো তুমি আছো জেনে যে মানুষ নিশ্চিন্ত নিদ্রায়, সেখানে কি নিষেধ মুদ্রা চলে?

 

 

ছেড়ে দিয়েছিলে সমস্ত রকম এগিয়ে যাওয়া, এই মর্মের শরীর ঘেঁসে পড়ে থাকা রেশমের টুকরো, আটকে থাকা তীব্র রাগ। তেমন কোনও অলংকার নেই, এই পৃথিবীতে সাজানোর কথা বারবার ব্যর্থ হয়েছে জেনে জেগে আছো নৈঃশব্দ্য প্লাবনে, অহংকারের সীমা-সকালে দৈনন্দিনে, শুকনো একধরণের আস্তানায় তোমার ছিন্ন মাংসল পরিভাষা সাদা এক সংলগ্নতা

 

 

আর এখানে এসেই মুক্ত হয়ে যায় চারপাশ, তীব্র একধরণের কালো পাপড়ির চাপে মাংসল হয়ে আছে সব, একধরণের বিস্মৃত কুয়োর শীতল স্পর্শ করে আছে অভ্যস্ত ম্লানিমা আমার সামর্থ্য আর কোনও শব্দ নয়, আমার স্পর্ধা আর কোনও মিছিল নয়, শুধু এই শীর্ণ চলনপ্রাণ আমার বারবার নেশায় ঝুঁকে পড়া, ভাষায় ফুটে থাকা একধরণের কাঁটা সবকিছুই আসলে সেই কৈশোরক হাত মারার মত, বারবার ছবি খুঁজছে, কামড় না বসাতে পারা স্তনবৃন্তের খোঁজে হাতড়ানো কাগজ।

 

কোথায় রাখা থাকে এতখানি শূন্যতা? কেন বারবার ছিটকে আসা ধুনোর গন্ধ বেরোন বাড়িগুলো থেকে? কেন লিখে রাখতে চাইছি এই ঘৃণা ও বন্ধুত্ব হারানো সময়জ্ঞান, সবই তো আকারহীন, সর্বত্র এক ধরণের বিশেষ ক্ষমা ও নিজের কোটরে ঢুকে খুঁড়ে নেওয়া ক্ষমতার শেষ অঙ্ক অধিকার!

 

এ সব দুপুরগুলো লেখা যায় না। এসব অলংকার শুধু বারবার কাউকে পরাতে চেয়ে ফেরত আসে, ছাইদানির গন্ধ মুখে বসে জানলায় এই দীর্ঘ বর্ণনায় স্থির হয় বীর্যপতনের কম্পনের মত আমি ও সন্তান, আমিও গেহ, পাশাপাশি হাঁটতে থাকি, নির্জীব খালের ধারে সূর্যাস্তের আগে। আবার কাউকে ডেকে ভালবাসতে ইচ্ছে করে খুব, ধ্বংস হতে ইচ্ছে করে, ধ্বংস ও তার রেশমের গিঁট বাঁধা রুমালে পরপর আঁকা হয়ে যেতে থাকে অসাড়ের অবিশ্বাস্য তেজ

 

আর এখানেই আমি আবিষ্কার করে নিতে চাইবো মহত্ব নামক শব্দটির আত্মপরিচয়, সমস্ত জ্বালা ও ছটফটানি আমার ভাষায় কেন আত্মরতি পরায়ণ কেন বারবার চৈত্র ও শ্রাবণ পালিয়ে যেতে চায় আর শুকনো সময়ের মধ্যে উঁচু হয়ে ওঠে গাজন

 

আর এখানেই একমাত্র তীব্র হয়ে ওঠে দীর্ঘদিন দর্শকের ভূমিকায় থাকা শারীরবৃত্ত, কারণ এখানেই গোটা ক্যালেন্ডার, এক দীর্ঘ প্রপঞ্চ, আর এখানেই সবাই উঠে আসে তাদের নির্দিষ্ট অভিনয় খোলসে এখানেই বয়স্ক মহিলা ডুকরে উঠলেন কৃষ্ণ পাবো না তার গান তো পাবো! তিনি তার খোলস ছুঁড়ে দেন অসাড়ের মুখে আরও একবার আমাদের যাবতীয় অর্থহীন মৃত্যু, নামহীন মৃত্যু গোত্রপূর্ণ শ্রাদ্ধ বাঙ্ময় হয়ে উঠল

 

সেই সব দীর্ঘ অপেক্ষা

সেই সব অসাড়ের মুখে গুঁজে দেওয়া খোলস

আর্ত আমার অর্থহীনতা

ক্রমশ চকচক করে ওঠে এই অজানার সামনে

এই সেই মার্চ মাস তার ভয়ঙ্কর জৃম্ভন খুলে বসে আছে

চতুর্দিকের ছাই ও পাথর

বিপর্যয় ও দীর্ঘ পথে চলা ক্লান্ত

এখানে এক গানের সন্ধে বিছিয়ে রেখেছে

 

এখানেই আমার ছোট হয়ে আসা, সাড়হীন আঙুলগুলো মেলে ধরা

অথচ কিছু ধরতে না পারা

আমার শরীর মেলে ধরা

অথচ কিছু টের না পাওয়া

আঘাত কি শুধু ব্যক্তি চেনে?

 

এখানেই ভেঙে আসে ছোটবেলায় শোনা গান

ডেলা হয়ে পড়ে থাকে

আমাদের পুরনো অক্ষর ও সুর

ক্রমশ একটা শেষ হয়ে আসা জাতির আত্মজ্ঞান

পুরনো একটা বাড়ির নাম

শতাব্দি শেষের প্রত্নতাত্ত্বিক খুঁজে পেয়েছেন

আমাদের অন্বয়ের ভাঙা শিষ বা তার তীক্ষ্ণতা

কোথাও উৎসব ছিল বা ধার্মিক উন্মাদনা

তাদের গিলে নিয়েছিল ঐতিহাসিকদের

অদম্য সম্মিলিত রসিকতার হাসি

আমাদের অভিধানে জমা হওয়া

ব্রাহ্মণ শব্দদের উপর ছড়িয়ে পড়ছে

সেই রোমান হরফে উদলে ওঠা বিকেলে

 

 

আমি মাথা তুলতে পারছি না অথচ আমার হাতের ছাপ পড়ছে হিমাচল থেকে কেরালা অব্দি স্পন্দিত হচ্ছে আমার অসাড় কচ্ছের রান থেকে সুন্দরবন অব্দি, এক বিশালাকার ছায়া ছড়িয়ে যাচ্ছে, আমার যাবতীয় মিথ্যে, এতদিন পর্যন্ত জমিয়ে রাখা ভান মানচিত্রের সমস্ত খাঁজকাটা সীমানাগুলো দিয়ে, ওই যেখানে পশ্চিম আফ্রিকার মাথা বাঁক নিচ্ছে, সেখান থেকে ছিটকে আসা ভেলায় ভাসা কিছু অভিযাত্রা থেকে এই বিরাট ভারতবর্ষ অব্দি প্রতিটা ঝোপে প্রতিটা স্তব্ধতায় কোপ মারছে অসাড়ের স্থির ধারালো কাস্তে

 

 

Copyright 2018 Subhro Bandopadhyay Published 31st Dec, 2018.

 

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, জন্ম ১৯৭৮, কলকাতা। প্রকাশিত কবিতার বই ৪টি। বৌদ্ধলেখমালা ও অন্যান্য শ্রমণ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্য আকাদেমির যুব পুরস্কার, পেয়েছেন মল্লিকা সেনগুপ্ত পুরস্কারও। স্পেনে পেয়েছেন আন্তোনিও মাচাদো কবিতাবৃত্তি, পোয়েতাস দে ওত্রোস মুন্দোস সম্মাননা। স্পেনে তিনটি কবিতার বই প্রকাশ পেয়েছে। ডাক পেয়েছেন মেদেজিন আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব ও এক্সপোয়েসিয়া, জয়পুর লিটেরারি মিট সহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে। কৌরব দলের অংশ

 

 

চিত্রঃ পাবলো লোপেস