Homepage 52nd Issue Content Editorial Barin Ghosal In Memorium পরিবিষয়ী কবিতা Your Comments Contact Us Books From Kaurab

Kaurab ONLINE 52: Editorial

 

এ বিজনঘর

 

স্মৃতিঃ বারীন ঘোষাল (৪ঠা ডিসেম্বর, ১৯৪৪ ২৮শে অক্টোবর ২০১৭)

 

প্রতিমা তার গুণে প্রতিমা। বস্তু তার গুণে বস্তু। বিজনের আলোবাতাসই বিজন। সেই বিজন একটা কালসীমা পেরিয়ে, অন্য আরেকটা আগামীর জন্য গড়ে দিয়ে মিলিয়ে গেলেন। বারীন ঘোষাল বলে লৌকিক জগতে আর কেউ নেই এখন। পড়ে আছে এ বিজনঘর।



 

বারীন ঘোষালের মৃত্যু আমাদের অনেককেই নানারকম দৃষ্টান্ত ও শিক্ষা দিয়েছে। আমার নিজের ক্ষেত্রে অনেক চক্ষু-উন্মোচনও। The vanguardia of poetry, বা অগ্রণী কবিতা (বুদ্ধদেব বসুর avant-gardeয়ের বঙ্গানুবাদ) সারাজীবন চর্চা করেও (মূলত সমান্তরাল কবিতা পত্রিকায়) একজন কবি ও কবিতাচিন্তক যে এত তরুণ ও তরুণতরর অনুগমন ও ভালোবাসা পেতে পারেন সেটা অভাবনীয়। যাঁর কবিতা বরাবরই দুরুহ তাঁরও যে এতটা শিক্ষিত পাঠকতা গড়ে উঠবে, সত্যিই অকল্পনীয়। যাঁরা আজ নতুন, অন্য, অপর বা অগ্রণী কবিতা লিখছেন, সেইসব তরুণদের কাছে বারীনদার স্বীকৃতি আশার উজ্জীবন। পাশাপাশি স্নেহশীলতা, উদাসীনতা, বাকসংযম, কাব্যসম্পর্কে যত্নশীলতার এক আশ্চর্য উদাহরণ বারীনদা। এই তুমুল জনপ্রিয়তা এসবেরই প্রমাণ।

 

১৯৮৮-১৯৯৮ বারীনদার সাহিত্য ও সমাজ জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যে সময়টায় বারীন ঘোষাল নিজেকে গদ্যে, প্রবন্ধে, কবিতায়, আন্দোলনে, যোগাযোগে, বন্ধুত্বে এক নতুন, অনতিক্রম্য জায়গায় নিয়ে যাচ্ছিলেন এর পরের পর্বে জারি হয় ওঁর কবিতা, কবিতাভাবনার দ্বিতীয় অধ্যায়, যে সময়ে বারীনদা উকো ঘষছিলেন নতুন কবিতা তত্ত্বে। সঙ্গে ছিলেন স্বপন রায়, রঞ্জন মৈত্র ও নতুন কবিতা পত্রিকার তরুণতররা।

 

১৯৯০য়ের শুরু থেকে আশীর দশকের বন্ধুবৃত্তের সাথে আলাপচারিতা ঘন হয় ধীমান চক্রবর্তী, স্বপন রায়, শুভঙ্কর দাশ, প্রণব পাল, রঞ্জন মৈত্র, অলোক বিশ্বাস, রামপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়, প্রভাত গঙ্গোপাধ্যায়, নৃসিংহমুরারী দে, উমাপদ কর প্রমুখ। ৯০ সাল থেকেই অতিচেতনার ধারণা দানা বাঁধতে থাকে বারীনদার মাথায়। এলাহাবাদ ঘুরে আসেন কমলদার সাথে। ত্রিবেণী সঙ্গমে এক করুণ, নিষ্ঠুর দৃশ্যের মুখোমুখি হয়ে দীর্ঘকবিতা সৎকার এর জন্ম হয়। সেই কবিতা প্রথম পড়া হয় বারীনদার টেলকো কোয়ার্টার পি১৪-৩য়ের টেবিলে অতিচেতনার কথা বইটা অসংখ্য তরুণ কবিকে স্বাভাবিক, প্রথাসিদ্ধ ও আর্কেটাইপাল আদিরূপী লেখার ধরন থেকে সমান্তরাল নিজস্বতায় সরিয়ে আনতে সাহায্য করে। কৌরবের বই, সকলেই জানেন বইমেলার কদিন মাত্র পাওয়া যায়। তা সত্ত্বেও অতিচেতনার কথা বইটা জনপ্রিয় হয়, একাধিক সংস্করণ হয়। বারীনদার চতুর্থ কবিতার বই হাশিস তরণীতে আছে অতিচেতনার কবিতার উজ্জ্বল উদাহরণ কবিতাভাবনার, তত্ত্বের বইয়ের সব কথা সবাই মেনে নিতে পারবেন না সেটাই স্বাভাবিক। কবিতাতত্ত্ব বেশিদিন স্থায়ীও হয়না। নতুন যুগ, নতুন ভাবনা আসে তার পরিবর্তকরূপে। বইয়ের আয়ু নির্ভর করে কতোটা অনুপ্রেরণা তরুণতর প্রজন্মের মধ্যে তা সঞ্চালিত করতে পারছে। সেই মানদন্ডের ওপরের দিকে অতিচেতনার কথা ক্রমশ উত্তরবঙ্গের কবিদের সাথে, দিল্লী হাটার্সের কবিদের সাথে বারীনদার ঘনিষ্ঠতা বেড়ে ওঠে পরবর্তী কালে।

 

গদ্যকার বারীন পাঠককে চমকে দেন ওঁর প্রথম উপন্যাস থেকেই - ৮৮ সালে বেরয় মাটাম বাংলা সাহিত্যের এক অতুলনীয় নারীবাদী উপন্যাস। আজকাল পত্রিকার পুস্তকালোচনায় লেখা হয় আগামী শতকের উপন্যাস। ক্রমে ক্রমে আসে এক ভারতীয় শীত, গিনিপিগ, একটি তথ্যচিত্র, জিন্দাবাদ খালকো প্রভৃতি। আমরা এক প্রলিফিক, বিধর্মী, সৃষ্টিশীল সাহিত্যিককে পাই যিনি সারাজীবন ছোটো পত্রিকায় লিখে গেলেন এবং কখন যেন পৌঁছে গেলেন এক উত্তুঙ্গ বেদীতে, যেখান থেকে তাঁকে টেনে নামানোর মত শক্তি কোনো ভারতীয় সাহিত্যিকের নেই।

 

সেই বিজন, বারীন ঘোষাল, চলে গেলেন তার আলোবাতাসে। জীবনের সব ক্ষেত্রে স্বজন বাড়াতে বাড়াতে যাওয়া বিজন, কেমন দুম্‌ করে চলে গেল। অনেকে বললেন কত যুগ পরে কল্পনার সাথে দেখা হলো বিজনের। কিন্তু কল্পনা তো বরাবর ছিলেনবিজনের যুক্তি ছিলো বিজনের মতোই, কল্পনার বীজে বাঁচতো তাঁর কবিতা। নিরেট হতো, দুরুহ হতো, সেই opacityর সাথেই ছিলো তাঁর নিটোল যৌথজীবন। খুব কম কবি আছেন বাংলা বাজারে যাঁরা discursive reading করতে পারেন, শেখাতে পারেন; তর্ক করার, ভিন্নমত প্রকাশ করার এমনকি মন্দ বলারও স্পেস তৈরি করে দিতে পারেন এবং এসবের পরেও যাকে জড়িয়ে ধরা যায়, যার সাথে অবিরত ঠাট্টা মস্করা করা যায়। এইসব নিয়েই বারীন ঘোষাল এক তুমুল ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার পাত্র কবিতা জগতে।

 

এর মধ্যে যে সামান্য কজন অল্পবুদ্ধি, অবিমৃশ্যকারী, এবং কেউ কেউ বিখ্যাত - সদ্যোমৃত কবিমানুষটাকে অপদস্থ, অপমান করতে গেলেন, তাদের লজ্জা পাবারও বোধহয় কোনো জায়গা রইলো না। কবিতা প্রেমের চেয়েও বিচিত্র। কার কোন কবিতা কোথায় কাকে, যুগে যুগান্তরে কানেক্ট করবে তার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। যিনি নিজেকে বলতেন বাংলা কবিতার ভিলেন, তিনিই যে আসল হীরো, আমরা বাংলা কবিতার কজন বুঝেছি আজ। কাল বুঝবে আরো অনেক স্রোত, অন্য প্রজন্ম।

 

আর্যনীল

১লা জানুয়ারী, ২০১৮

সিন্সিন্যাটি, ওহায়ও